মুদ্রার ইতিহাস ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের। মোহর, মুদ্রা, সিলমোহরের প্রচলন ছিল প্রাচীন সভ্যতায়। প্রাচীনকালে বিনিময় প্রথা চালু ছিল, অর্থাৎ এক জিনিসের বিনিময়ে অন্য জিনিস ক্রয় বিক্রয় চলতো। তবে মুদ্রা এসেছে প্রাচীন গ্রীসের লিডিয়ানদের হাত ধরে, প্রায় ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ভারতবর্ষেও মুদ্রার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় মুদ্রার প্রচলন শুরু হলে দেখা যায়, মুদ্রায় সাধারণত রূপকথা, উপদেশ, উদ্ধৃতি বা বাণী খোঁদাই করা থাকতো। এছাড়াও বিভিন্ন দেব-দেবী যেমন শ্রীলক্ষ্মী, শ্রী কৃষ্ণ বা পশুপাখি ইত্যাদির ছবি খোঁদাই করা থাকতো। পরবর্তী সময়ে শাসক বা রাজা-রানী র ছবি খোদিত মুদ্রার প্রচলন দেখা যায়। এই মুদ্রাগুলি সেই সময়ের এক মূল্যবান দলিল। শুধু তাই নয় সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে। যা সত্যিই দুর্লভ। ছবিঃ সেলুকাসের সময়ের মুদ্রা। একপাশে দেবতা জিউসের মূর্তি অন্যপাশে হাতির পীঠে যোদ্ধা। ভারতের প্রথম মুদ্রা ভারতের প্রথম মুদ্রা ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ-৫ম শতকের। গ্রীক সম্রাট আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট যখন ভারত আক্রমণ করলেন ঠিক সেই সময়ের আগের মুদ্রাকেই প্রথম মুদ্রা হিসেবে ধরে নেয়া হয়। ভারতের গান্ধার, কুরু, শাক্য, সৌরসেনা, সৌরাষ্ট্র ইত্যাদি অঞ্চলে এই ধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল। মুদ্রাগুলোর বেশিরভাগই ছিল রূপার। তবে মুদ্রা তৈরিতে তামাও ব্যবহৃত হত। সৌরাষ্ট্রের মুদ্রাগুলোতে দেখা যেত ষাড়, মগধের মুদ্রাগুলোতে দেখা যেত বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক চিহ্ন ইত্যাদি। এগুলিকে বলা হয় পাঞ্চমার্কড মুদ্রা। আবার মগধের মুদ্রা গুলিতেও বিভিন্ন চিহ্ন খোঁদাই করা থাকতো। গান্ধারা ও মৌর্য সাম্রাজ্যের মুদ্রায় বিভিন্ন জ্যামিতিক প্রতীক এবং সূর্য, গাছ, প্রাণী ইত্যাদি খোঁদাই করা ছিল। চাণক্যের অর্থশাস্ত্রেও এই ধরনের মুদ্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, রৌপ্যরূপা বা রৌপ্যমুদ্রা, সুবর্ণরূপা বা স্বর্ণমুদ্রা, তামারারূপা বা তাম্রমুদ্রা, শীষারূপা ইত্যাদি। চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে মুদ্রাকে রুপা বলেই অভিহিত করা হয়েছে। ইন্দো-গ্রীক মুদ্রা আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট কর্তৃক ভারতজয়ের মাধ্যমে ইন্দো-গ্রীক সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। পরবর্তীতে উল্লেখযোগ্য মুদ্রাগুলি তাদের হাত ধরেই আসে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম এবং দ্বিতীয় শতকের দিকে। মুদ্রাগুলো মূলত ছিল রূপার এবং গোলাকৃতির বা আয়তাকার। এই মুদ্রাগুলিতে প্রাকৃত ভাষায় এবং খরোষ্ঠী লিপিতে লিখা হত। তাতে শাসকের নাম ও ছবি খোঁদাই করা থাকতো। সেই সাথে বিভিন্ন গ্রীক উপকথা বা বিষয়বস্তু মুদ্রায় খোঁদাই করা থাকতো। গবেষকদের ধারণা, প্রথমদিকে মুদ্রাগুলো সরাসরি গ্রীস থেকেই আসত। পরবর্তীতে যে মুদ্রাগুলো পাওয়া যায় তা একপ্রকার গ্রীক ও ভারতীয় উপকথার মিশেলে তৈরি। যেমন, রাজা আগাথোকলসের একটি মুদ্রায় শ্রীকৃষ্ণকে দেখা যায় চক্র হাতে গ্রীক পোশাক পরিহিত অবস্থায়। মুদ্রায় খোদিত প্রতিকৃতিগুলো ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম শিল্প কর্ম এবং বিষদ যা হেলেনিস্টিক শিল্পের পরিচায়ক। পরবর্তীতে ভারতবর্ষের মুদ্রাগুলো যে এই গ্রীকদের অনুকরণেই তৈরি করা হতো বলে ধারনা। কুষাণ যুগের স্বর্ণ মুদ্রা ১ম থেকে ৪র্থ শতাব্দীতে প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ঘটে কুষাণ রাজাদের হাত ধরে। এছাড়া তামার মুদ্রাও প্রচলিত ছিল সেই সময়ে। গ্রীক রীতি অনুসারে মুদ্রায় বিভিন্ন প্রতীক খোদাই করা হতো যা প্রায় পরবর্তী আট শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল। মুদ্রাগুলোর একদিকে শাসকের প্রতিকৃতি, নাম ও উপাধি এবং অন্যদিকে দেব-দেবীদের চিত্র আঁকা কুষাণ যুগে যে মিশ্র সংস্কৃতির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় মুদ্রাগুলো দেখলেই। গৌতম বুদ্ধ থেকে গ্রীক দেবতা অবধি সবই খুব সুন্দরভাবে মুদ্রাগুলোয় স্থান পেয়েছেন। গুপ্ত মুদ্রা স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন শীর্ষে পৌঁছায় ভারতের স্বর্ণযুগ নামে অভিহিত গুপ্ত যুগে। সময়টা ছিল ৩য়-৬ষ্ঠ শতক। গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রা ছিল সুনিপুণ এবং সমৃদ্ধ। মুদ্রাগুলো সাধারণত দিনার নামেই পরিচিত ছিল। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা এই মুদ্রাগুলোর একদিকে খোঁদাই করা থাকত সংস্কৃত উপকথা, দেবদেবী, বিশেষত শ্রীলক্ষ্মীর মূর্তি। অন্যদিকে থাকত শাসকের ছবি। রাজা সমুদ্রগুপ্ত সাতটি আলাদা ধরনের মুদ্রা জারি করেন- প্রমাণ মুদ্রা, তীরন্দাজ মুদ্রা, কুঠার মুদ্রা (সামরিক সমৃদ্ধির পরিচায়ক), অশ্বমেধ মুদ্রা। সেই সময় রাজ্য বিস্তৃতির উদ্দেশ্যে ঘোড়া বলীদান করা হত, তারই রূপ ফুটে উঠেছে এই মুদ্রায়। এছাড়াও মুদ্রায় রাজা-রানী মুদ্রা (রাজা চন্দ্রগুপ্ত ও রানী কুমারদেবীর প্রতিকৃতি সংবলিত মুদ্রা), বাঘ হত্যাকারী মুদ্রা এবং গীতিকবি মুদ্রা (যাতে রাজাকে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে দেখা যায়) ইত্যাদি ছিল। গুপ্ত যুগে শিল্প-সাহিত্যের যে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল তার প্রমাণ এই মুদ্রাগুলো। গুপ্ত যুগ পরবর্তী মুদ্রা ৫৫০-১২০২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গুর্জরা, প্রতিহার, চালুক্য প্রভৃতি সাম্রাজ্যের দ্বারা যে মুদ্রা জারি হয়েছে সেগুলো ইন্দো-সাসানিয়ান মুদ্রা বলে পরিচিত। এই মুদ্রা গুলিতে একপাশে জ্যামিতিক ধাঁচে সাম্রাজ্যের সার্বভৌমত্বের চিহ্ন এবং অন্যপিঠে অগ্নির দেবতা মোটিফের চিহ্ন খোঁদাই থাকত। ইসলামী শাসনে ভারতীয় মুদ্রা ১০ম শতাব্দীতে গজনীর সুলতান মাহমুদ ভারতবর্ষ জয়ের পর বিশেষ ধরনের মুদ্রার প্রচলন করেন। রূপার মুদ্রাতে আরবি এবং সংস্কৃতে সুলতানের নিজের নাম খোঁদাই করেন। পরবর্তীতে মুহম্মদ ঘুরী স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার প্রচলন ঘটান। আশ্চর্য হলেও সত্যি সুলতান, স্বর্ণমুদ্রার একদিকে লক্ষ্মীর মূর্তি অন্যদিকে দেবনগরী লিপিতে নিজের নাম খোঁদাই করে দিয়েছিলেন। ১২ শতকের মধ্যে তুর্কী সুলতানরা মুদ্রায় ইসলামী ক্যালিগ্রাফি খোঁদাই করে দেন। এছাড়াও বিভিন্ন নকশা, উপকথা, তারিখ মুদ্রায় জুড়ে দিলেন। এই সময়ের মুদ্রাগুলি ছিল সোনা, রূপা এবং তামার। এগুলোকে বলা হত ‘তঙ্কা’। সম্রাট বাবরের সময় শুধু রৌপ্যমুদ্রা প্রচলিত থাকলেও পরবর্তীতে স্বর্ণ এবং তাম্রমুদ্রার প্রচলন হয়। সম্রাট শের শাহ সুরির হাত ধরে মোঘল মুদ্রার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছিল। একধরনের রূপার মুদ্রা যার নাম ছিল ‘রূপীয়া’ যা থেকে ভারতের বর্তমান মুদ্রা ‘রূপী’র প্রচলন ঘটে। স্বর্ণমুদ্রাগুলোকে মোহর বলা হতো এবং তাম্রমুদ্রাকে বলা হতো দাম। তাছাড়া সম্রাট আকবর ভিন্ন ঘরানার মুদ্রা জারি করেন। উদাহরণস্বরূপ: রাম এবং সীতার মূর্তি দিয়ে মুদ্রা, মেহেরাবী মোহর (ষড়ভূজাকৃতির স্বর্ণমুদ্রা) ইত্যাদি। তাছাড়া আকবর এবং জাহাঙ্গীরের সময়ে তাঁদের মূর্তি খোদিত মুদ্রারও দেখাও পাওয়া যায়। তাছাড়া মুদ্রায় রাশিচক্র, প্রকৃতি, সাহিত্যের নিদর্শন, ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদি মুদ্রাগুলিকে এক নতুন মাত্রা এনে দেয়। পরবর্তীতে সম্রাট আওরঙ্গজেব নির্দিষ্ট মানের মুদ্রার প্রচলন করেন যাতে শাসকের নাম, টাঁকশাল এবং মুদ্রা প্রচলনের তারিখ উল্লেখ থাকত। গবেষকদের মতে, মোঘলদের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল সারা সাম্রাজ্য জুড়ে একই মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ ইন্ডিয়ান কয়েন্স এন্ড হিস্ট্রি এবং উইকিপিডিয়া। Image Source: Indian Coins and History