অ্যাথলিট হিমা দাসঃ ভারতের অহংকার উত্তর-পূর্বের এক লড়াকু মেয়ে হিমা দাস। এতোটাই গরীব যে খাওয়ারও জুটত না। দেশের ৬৫ শতাংশ গরীব মানুষ যেখানে স্বপ্ন দেখতে জানেনা, সেই মেয়েটিই আজ ভারতকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে ভারতকে সোনা এনে দেয়ার। অদম্য সাহস আর মেধা থাকলে কেউই জীবনে হেরে যায় না। এই কথাটিই প্রমান করে দিয়েছেন হিমা দাস। যে মেয়েটির এক জোড়া ‘স্পোর্টস সুস’ ছিলনা, আজ সেই মেয়েটির পেছনেই দৌড়োয় বিশ্বের তাবড় তাবড় স্পোর্টস ব্র্যান্ড গুলি। মাত্র ২২ বছর বয়েস। অনেক স্বপ্ন এখনও চোখেমুখে। ১৯ বছর বয়েসেই হিমা কিন্তু প্রমান করে দিয়েছেন, তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া। ২০১৯ সালে, ১৯ দিনে ৫ টি স্বর্ণপদক জিতে সারা বিশ্বের কাছে সারা দেশের নাম আলোকিত করেছিলেন অসমের এই পাহাড়ি কন্যা। হিমা দাসের শৈশব-কৈশোরঃ অ্যাথলিট হিমা দাস, ৯ জানুয়ারী ২০০০ সালে আসামের নগাও জেলার, ধিং-এ জন্মগ্রহণ করে। হিমা একটি দলিত পরিবারের নিতান্ত গরীব ঘরের কন্যা। হিমার বাবার নাম রনজিৎ দাস। পেশায় তিনি একজন ছোট কৃষক। হিমার মায়ের নাম জোমালি দাস। তিনি একজন গৃহিণী। হিমাদের বাড়িতে মোট ১৬ জন সদস্য রয়েছে। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থা এমন ছিল যে, দুবেলা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করাই ছিল চ্যালেঞ্জের। পরিবারে হিমা এবং তার বাবা-মা ছাড়াও ৫ ভাই-বোন রয়েছে। হিমা তার প্রাথমিক পড়াশুনা করেন ধিং গ্রামেই। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের কারণে হিমা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পাশাপাশি অর্থনৈতিক টানাপড়েন তো ছিলই। শেষ পর্যন্ত ফুটবল’কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। পাড়ার ক্লাবে, জেলায় ফুটবল খেলে একশ দুশো টাকা পেতেন। সেই টাকায় রেশন তুলতেন। লড়াকু হিমা নওগাঁয় প্রায় প্রতি বছরেই বন্যা হতো। জায়গাটি খুব বেশী একটা উন্নত ও নয়। হিমা যখন গ্রামে থাকতেন বন্যার কারণে তিনি বেশ কিছু দিন অনুশীলন করতে পারেতেন না কারণ তিনি যে মাঠে অনুশীলন করতেন সেই মাঠ, এমনকি পুরো গ্রামই বন্যার জলে প্লাবিত থাকতো প্রতি ব্রব?হিমা এই জল থই থই মাঠেই প্রাকটিস করতেন। কিভাবে গ্রাম্য মেয়েটি আজ দেশের গর্ব? হিমা ২০১৭ সালে অসমের রাজধানী, গুয়াহাটিতে একটি ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানেই প্রথম হিমাকে চোখে পরে কোচ নিপুণ দাসের। এরপর নিপুন দাস’ই হিমাকে একজন অ্যাথলেট হয়ে ওঠার জন্য সমস্ত ধরনের প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। পরে এক সাক্ষাতকারে হিমার প্রথম কোচ নিপুন দাস হিমা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন,’২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে হিমা রাজধানী গুয়াহাটিতে স্থানীয় একটি ক্যাম্পে যোগ দিতে এসেছিলেন। তখন হিমা যেভাবে ট্র্যাকে ছুটছিলেন, আমার মনে হয়েছিল এই মেয়েটির মধ্যে আরও এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। একদিন এই মেয়েই বিশ্ব জয় করবে’। তাই করলেন হিমা ঠিক দুই তিন বছরের মধ্যে। হিমার কাছে পরিবারের সব কথা শুনে নিপুন দাস হিমার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে হিমার গ্রামের বাড়িতে যান। তিনি, হিমাকে আরও ভাল কোচিংয়ের জন্য গুয়াহাটিতে পাঠাতে বলেন হিমার বাবা-মা কে। কিন্তু হিমার বাবা-মায়ের হিমাকে গুয়াহাটিতে রেখে কোচিং দেয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিলনা। কিন্তু মেয়ে এগিয়ে যাক সেটা দেখতে চেয়েছিলেন হিমার বাবা-মা। এই কঠিন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত হিমার কোচ নিপুন দাস, হিমার বাবা-মায়ের সাথে কথা বলে এবং হিমার গুয়াহাটিতে থাকার সমস্ত খরচ আমি বহন করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এরপর হিমার মা-বাবা হিমাকে গ্রামের বাইরে পাঠাতে রাজি হয়। হিমার ক্যারিয়ার প্রথমদিকে হিমা ফুটবল খেলতে পছন্দ করত। হিমা তার গ্রামের বা জেলার আশেপাশে ছোট ছোট ফুটবল ম্যাচ খেলে ১০০-২০০ টাকা জিতত। তাকে ফুটবলে অনেক দৌড়াতে হয়েছিল যার কারণে হিমার স্ট্যামিনা ভাল হতে থাকে দিন কে দিন। আর এই কারনেই হিমা ট্র্যাকে আরও ভাল করতে সক্ষম হয়। কোচ নিপুণ দাসই প্রথম হিমাকে ফুটবল থেকে অ্যাথলেটিক্সে আসার জন্য প্রভাবিত করেছিলেন হিমা কে। তারপর প্রাথমিকভাবে হিমা ২০০ মিটারের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। কিন্তু পরে হিমা এবং হিমার কোচ বুঝতে পারেন যে, তিনি ৪০০ মিটারে আরও বেশী সফল হবেন। এরপর একের পর এক সাফল্য। ফিনল্যান্ড ওয়ার্ল্ড অনূর্ধ্ব ২০ চ্যাম্পিয়ানশিপে সোনা হিমা যখন দৌড়তে শুরু করেন তখন দৌড়ের প্রথম ৩৫ সেকেন্ডে, ট্র্যাকে থাকা, শীর্ষ তিন অ্যাথলিটের মধ্যে ছিলেন না। ফিনল্যান্ডের ট্র্যাকে হিমাকে লাইভ দৌড়াতে খুব কম কেউই দেখেছেন এবং চেনেন। কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে বসে ছিলেন স্টেডিয়ামে হিমার প্রথম কোচ নিপুণ দাস। তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন অধীর আগ্রহে হিমার ফিনিশিং দেখার জন্যে। যখন হিমা শেষ ১০০ মিটার দৌড়ে চতুর্থ ছিলেন তখন কোচ নিশ্চিত যে, হিমা এবার সোনা আনবে। নিপুন জানতেন, যে হিমা কিছুটা দূর ধীরগতিতে দৌড়ুবে এবং শেষ ১০০ মিটার হিমা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে দৌড়ে ফিনিশ করবে আর রেড রিবন ছুবেন এবং বাজীমাত করবে। এটাই হিমার বিশেষত্ব। একাধিক সাক্ষাতকারে, হিমার কোচ নিপুন দাস পরে একথা স্বীকারও করেছেন। এবং তাই হল। আসামের অজ গ্রামের মেয়ে হিমা দাস ফিনল্যান্ডের ‘বিশ্ব ইউ-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৮’ -এ স্বর্ণপদক জিতে রাতারাতি শিরোনাম চলে এলো। সেই শুরু৷ ১৮-তম এশিয়ান গেমসে সোনা ১৮ বছর বয়সী হিমা ‘আইএএএফ ওয়ার্ল্ড অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে’ সোনা জিতে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন ২০১৮ সালে। এর পরেই সারা দেশ ‘এশিয়ান গেমসে’ হিমার কাছে সোনার পদক আশা করেছিল। এবং হিমা এর জন্য যোগ্যতম প্রতিযোগীও ছিল। কিন্তু সেমিফাইনালে তার একটি ফাউলের কারণে সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। ঐ প্রতিযোগিতায় হিমাকে রৌপ্য পদক নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ফাইনাল রেসে তিনি ৫০.৭৯ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন। পোল্যান্ড সফরে দুটি পদক হিমা দাস ২০১৯ সালে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত দু’টি প্রতিযোগিতায় ২ টি স্বর্ণপদক জিতে আবারও শীর্ষে। ২০০ মিটার দৌড়ে তিনি দুটি পদক পেয়েছেন। হিমা ২ জুলাই ২০১৯ ‘পজনান অ্যাথলেটিক্স গ্র্যান্ড প্রিক্সে’ ২০০ মিটার দৌড় সম্পূর্ণ করে ২৩.৬৫ সেকেন্ড সময়ে। এবং প্রথম পদক জিতে নেয়। ঐ বছরের ৭ই জুলাই ‘কুন্টো অ্যাথলেটিক্স মিটে’ ২৩.৯৭ সেকেন্ডে ২০০ মিটার দৌড় শেষ করে, দ্বিতীয় স্থানাধিকারি হন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। চেক প্রজাতন্ত্র সফরে ৫টি পদক পেয়ে ইতিহাস পোল্যান্ডে হিমা যে ধরনের প্রদর্শনী করেছিলেন, তিনি চেক প্রজাতন্ত্রেও সেই একই রকম প্রদর্শন করেছিলেন। এর পাশাপাশি মাত্র ১৯ দিনে টানা ৫ টি স্বর্ণপদক জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করেন উত্তরপূর্বের এই উনিশ বছর বয়সী মেয়েটি। যেখানে তিনি পোল্যান্ডে ২টি পদক এবং চেক প্রজাতন্ত্রে ৩ টি পদক জিতেছেন। হিমা ‘ক্লোদনো অ্যাথলেটিক্স মিট’ এবং ‘তাবোর অ্যাথলেটিক্স মিটে’ ২০০ মিটারে বিভাগে এবং ‘নোভ মেস্তো নাদ মেটুজি গ্র্যান্ডপ্রি’-তে ৫২.০৯ সেকেন্ডে ৪০০ মিটার দৌড়ে সোনা জিতেন। ১৯ দিনে ১৯ বছরের মেয়ের ৫টি পদকের ইতিহাস প্রথম স্বর্ণপদকঃ ২ জুলাই ২০১৯ সালে ২৩.৬৫ সেকেন্ডে ২০০ মিটার দৌড় সম্পূর্ণ করে পোল্যান্ডে ‘পোজনান অ্যাথলেটিক্স গ্র্যান্ড প্রিক্স’ জিতেছে৷ দ্বিতীয় স্বর্ণপদকঃ ৭ জুলাই ২০১৯ সালে পোল্যান্ডে ‘কুন্টো অ্যাথলেটিক্স মিট’-এ ২৩.৯৭ সেকেন্ডে ২০০ মিটার দৌড় সম্পূর্ণ করেছেন। তৃতীয় স্বর্ণপদকঃ ১৩ জুলাই ২০১৯ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের ‘ক্লাদনো অ্যাথলেটিক্স মিট’-এ ২০০ মিটার দৌড় সম্পূর্ণ করেছেন ২৩.৪৩ সেকেন্ডে। চতুর্থ স্বর্ণপদকঃ ১৭ জুলাই ২০১৯ সালে, চেক প্রজাতন্ত্রের ‘তাবর অ্যাথলেটিক্স মিটে’ মাত্র ২৩.২৫ সেকেন্ডে ২০০ মিটার দৌড় জিতেছে ভারতের এই দ্রুত মানবী। পঞ্চম স্বর্ণপদকঃ ২০ জুলাই ২০১৯ সালে হিমা, ‘নোভ মেস্তো নাদ মেটুজি গ্র্যান্ডপ্রি’-তে ৫২.০৯ সেকেন্ডে সময় নিয়ে ৪০০ মিটার দৌড় জিতেছেন। অলিম্পিকের স্বপ্নে বিভোর হিমা এই মুহূর্তে প্র্যাকটিসে ব্যাস্ত। ভারতের দ্রুত মহিলা রাণারের মধ্যে সেই চিত্রাঙ্গদার ছবি। লড়াকু পাহাড়ি মেয়েরা এমনটাই হয়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ Sports Authority of India/ Times of India/ Indian Express/ India Today Picture Courtesy by: India Today