উত্তরপূর্বের পাহাড়ি রাজ্য মনিপুরের মেয়ে মেরি কম আজ প্রকৃত অর্থেই বক্সিংয়ের ‘সোনার মেয়ে’। ভারতের সোনার মেয়ে মেরিকম-এর অনুশীলন চলত সবাইকে লুকিয়ে চুরিয়ে। মেয়ে খেলাধুলো করুক তাতে বাবার মোটেই সায় ছিল না। রাজ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর খবরের কাগজে ছবি প্রকাশিত হওয়ায় পুরস্কারের বদলে বাবার কাছ থেকে যে মেয়ের কপালে জুটেছিল তিরস্কার, সেই মেয়েই এখন এদেশের খেলাধুলোর জগতে বড় আইকন। বক্সিংয়ে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন মেরি কম। দেশকে এনে দিয়েছেন একগুচ্ছ আন্তর্জাতিক সাফল্য। প্রথম ভারতীয় মহিলা বক্সার হিসেবে অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার কৃতিত্বও মেরি কম-এর ঝুলিতেই। মণিপুর ছোট্ট রাজ্য হলেও খেলাধুলো মনিপুরের সুখ্যাতি কম নয়। ফুটবল থেকে ভারোত্তোলন প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই রাজ্য থেকে উঠে এসেছেন অনেক খেলোয়ার। বক্সিংয়ে ডিঙ্গো সিংহ এদেশের পরিচিত মুখ। ভারতীয় মহিলা বক্সার মেরি কম এর একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী মেরি কম-এর পুরো নাম মাংতে চুংনেইজাং মেরি কম। ১৯৮৩ সালে ১লা, মার্চ মণিপুর রাজ্যের চূড়াচাদপুরের অজগ্রাম কাংসেই গ্রামের এক গরিব পরিবারে মেরী কম-এর জন্ম। কুকি ভাষী মেরি কম, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়। কঠিন দারিদ্রতার সাথে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে কেটেছে উনাদের শৈশব। বাবা–মাকে জুম চাষে সাহায্য করা থেকে শুরু করে বাড়ির ছোট ভাইবোনের দেখশোনা, রান্না করা, জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ সহ ঘর গৃহস্থালির প্রায় সব কাজই সামলাতে হত অল্প বয়সেই। এরই মধ্যে প্রাথমিক স্তরে পড়াশোনা শুরু লোকতাকের ‘ক্রিশ্চিয়ান মডেল হাইস্কুলে’। মইরাং-এর ‘সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে’ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ভর্তি হন ইম্ফলের ‘আদিমজাতি স্কুলে’। জেনে আশ্চর্য হবেন, আজ বক্সার হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠলেও ছেলেবেলায় কিন্তু মেরি কম অ্যাথলিট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। উনার বক্সার হয়ে উঠার পেছনে রয়েছে এক গল্প। আসলে এশিয়ান গেমসে নিজের রাজ্য মনিপুরের সোনাজয়ী বক্সার ডিঙ্গো সিংহের সাফল্যই মেরিকে বক্সার হয়ে ওঠার প্রেরণা জোগায়। এরপর থেকে বক্সিং রিং হয়ে ওঠে মেরির সব চেয়ে ভালোলাগার জায়গা। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ায় (সাই) যোগ দেওয়ার পর মেরির সাফল্যের রাস্তাটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। মেরি কম-এর বিবাহিত জীবন ২৯ বছরের এই বক্সার তার সাফল্যের অনেকটা কৃতিত্বই দিতে পারেন সাহস ও উৎসাহ যুগিয়ে যাওয়া তার স্বামী অনলার কমকে। যমজ দুই সন্তানের মা হওয়ার পর শেষ তিনটি বিশ্বখেতাব ঘরে তুলেছেন মেরি। এই জয় বিরলের থেকেও বিরলতম। মেরি কম-এর কথায়, ‘আমি যখন অনুশীলন বা বিভিন্ন ইভেন্টের জন্য দেশের বাইরে থাকি তখন সন্তানদের খুব মিস করি। তখন স্বামী অনলার কম’ই হয়ে ওঠেন ওদের বাবা এবং মা। তিন পুত্র রেচুংভার, খুপনিভার ও প্রিন্স কম বাবার মতোই মা মেরির বড় সমর্থক। তার লড়াকু জীবনের ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যে ‘হাম সে হ্যায় লাইফ‘ নামে তৈরী হয়েছে টিভি সিরিয়াল। তৈরি হয়েছে হিন্দি ফিল্ম ‘মেরি কম’। মেরি কম-এর রূপো জয় ২০০১ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়েসেই মেরি ‘ওমেখ ওয়ার্ল্ড অ্যামেচার বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে’ নেমে আমেরিকার পেনসিলভানিয়া থেকে ৪৫ কেজি বিভাগে রৌপ্য পদক জিতে নেন। প্রথম বছরেই বিশ্ব প্রতিযোগিতা থেকে পদক জয় । এই সাফল্যের পরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মেরি কমকে। মেরি কম-এর খেতাব প্রথমবার বিশ্ব লড়াইয়ে নেমে যে ছাপ তিনি রেখে এসেছিলেন পরবর্তী প্রতিযোগিতা গুলোতে তার প্রভাব দেখেছে বিশ্ব। টানা পাঁচ বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের গৌরব বাড়িয়েছেন মেরি কম। ২০০২ সালে ‘তুর্কি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে’ ৪৫ কেজি বিভাগে সোনা জয় দিয়ে শুরু। এরপর ২০০৫ সালে রাশিয়ায়, ২০০৬ সালে দেশের মাটিতে (নিউ দিল্লিতে), ২০০৮ সালে ‘চিন বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে’ একই বিভাগে লড়াইয়ে নেমে রোমানিয়ান বক্সারকে ধরাশায়ী করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজ থেকে জিতে আনেন নিজের পঞ্চম বিশ্ব খেতাব। গোল্ডেন গার্ল মেরি কম শুধু পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়াই নয়। মেরি কমের সাফল্যের ঝুলিতে আছে আরও অনেক আন্তর্জাতিক সাফল্য। ‘এশিয়ান উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপে’ সোনা জিতেছেন চারবার। চতুর্থ সোনাটি জিতেছেন মঙ্গোলিয়ায় প্রতিযোগিতায় নেমে ৫১ কেজি বিভাগে। এই বিভাগেই চিনের ওয়াঝৌ এশিয়ান গেমসে ২০১০ সালে জিতেছিলেন ব্রোঞ্জ। ডেনমার্কের ভেনাস উইমেন্স বক্সকাপ, হ্যানয়ের এশিয়ান ইন্ডোর গেম্স, চিনের এশিয়ান উইমেন্স কাপের মতো একাধিক প্রতিযোগিতাও মেরির জ্যাব, আপার কাট, হুকে বারবার পরাস্ত হয়েছেন পৃথিবীর সেরা সেরা প্রতিযোগিরা। পাঁচ ফুট দু’ইঞ্চি (৫.২”) উচ্চতার এই মেয়েটি রিংয়ে নেমে কতটা নির্মম, সেটা উনার সাফল্যই জানিয়ে দেয়। পাঁচবার বিশ্বজয়ের পর মেরির লক্ষ্য ছিল অলিম্পিকে অংশ নেওয়া। ২০১২ সালে, লন্ডন অলিম্পিকে মেয়েদের বক্সিংয়ের ‘ফ্লাইওয়েট বিভাগে’ প্রথম বছরেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যান মেরি। ওলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদক জয় করে নিয়ে গর্বিত করেন ভারতবাসীকে। মেরি কম-এর পুরস্কার ২০০৪ সালে হয়েছেন বক্সিংয়ের ‘অর্জুন‘। ২০০৬ সালে পদ্মশ্রী। ২০০৮ সালে বিশ্ব অ্যামেচার বক্সিং সংস্থা তাঁকে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট মেরি’ আখ্যায় ভূষিত করে । ২০০৯ সালে রাজীব গাঁন্ধী খেলরত্ন পুরস্কার। ২০১৩ সালে পদ্ম ভূষণ। ২০২০ সালে পদ্ম বিভূষণ। একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে মেরি বলেছিলেন, “বক্সিং ইজ নট জাস্ট আ ম্যান্স গেম।” রিংয়ে নেমে বারবার তারই প্রমান দিয়েছেন মেরি। বক্সিং করলে মেয়ের বিয়ে হয় না। এই ভয়েই মেরি-কে বক্সিং করতে দিতেন না মেরির বাবা-মা। কিন্তু অর্জুন পুরস্কার নিতে সেই বাবা-মা’কে সঙ্গে নিয়েই রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়েছিলেন মেরি কম। মনিপুর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেরি কমের বক্সিং নিয়ে স্বপ্ন অনেক । নিজেই গড়ে তুলেছেন বক্সিং অ্যাকাডেমি । সেখানে অনেক মেয়ে মেরি’কে আইকন মেনে শিখতে আসছেন বক্সিং। এই অ্যাকাডেমি থেকেই দেশের জন্যে নতুন বক্সার তুলে আনতে চান তিনি। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ মেরি কমের জীবনী A Short Biography of Mary Kom Sports Authority of India (SAI)