১৯৯০ এর দশকে বাংলা গানের জগতে চলছিল এক সাংঘাতিক পরীক্ষানিরীক্ষা। বাংলার স্বর্ণযুগের গান যখন প্রায় স্তিমিত তখন কিছু গায়ক এবং তাদের গানের দল যা বাংলা ব্যান্ড নামে পরিচিত পাশ্চাত্য সঙ্গীত এবং পাশ্চাত্যের অনুকরণ করে খুব সুকৌশলে এক নতুন ঘরানার সঙ্গীতের জন্ম দিল। ভারতীয় রাগ সঙ্গীত বা লোক সঙ্গীতে অভ্যস্থ প্রবীণ বাঙালি শ্রোতারা এই সঙ্গীতকে নিতে পারছিলেন না। কারন বাংলার সঙ্গীত মানেই মাঠে ঘাটে মানুষের মুখে মুখে গীত জীবন যাপনের গান। উৎসব, আনন্দ আবার দুঃখ বা অভিযোগ কিংবা বিপ্লবেরও গান। বাঙালি একটার পর একটা আন্দোলন, বিদ্রোহ-বিপ্লবও সংগঠিত করেছে এই গানকে পুঁজি করেই। বিশেষ করে বাংলা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে কয়েকজন বরেণ্য শিল্পী দেশের মানুষকে নিজেদের সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে বেশীরভাগ শিল্পীই কিন্তু বাংলার লোক গান, মেঠো সুর আর গ্রাম্য জীবনকেই আঁকড়ে থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কালিকাপ্রসাদের শৈশব এবং শিক্ষারম্ভ বরাক উপত্যকার এমনই একজন শিল্পী ছিলেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। উত্তরপূর্বাঞ্চলের ত্রিপুরা, কাছাড় এবং বাংলার লোক গানকে সারা পৃথিবীব্যাপী নতুন আঙ্গিকে এবং পরিবেশনায় পৌঁছে দিয়েছিলেন এই শিল্পী। ত্রিপুরার শ্রদ্ধেয় শিল্পী শচীন দেববর্মণের পর খুব সম্ভবত কালিকাপ্রসাদই এই অঞ্চলের মেঠো সুর আর সহজসরল ভাষাকে সঙ্গীতের মাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছিলেন অগণিত শ্রোতার সামনে। তাই আজকের প্রজন্মের কাছেও প্রিয় কালিকাপ্রসাদের গান, ‘কি দুগ্যি দেখলাম চাচী, কি ঠাকুর দেখলাম চাচা…’। কালিকাপ্রসাদের জন্ম ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে বরাক উপত্যকার শিলচরে। স্থানীয় স্কুলেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি চলে যান উচ্চ শিক্ষার জন্যে কলকাতায়। কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। ছোটবেলা থেকেই দারুণ মেধাবী ছেলে ছিলেন কালিকাপ্রসাদ। সবার প্রিয় ছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি সঙ্গীতের প্রতি ছিল উনার অসম্ভব ঝোঁক। ছোটবেলা থেকেই গ্রামে গ্রামান্তরে ঘুরে ঘুরে তিনি লোক গান, কবিতা, মেঠো সুর আর হারিয়ে যাওয়া সব বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ করতেন। উনার সঙ্গীতের অনুপ্রেরণা ছিলেন কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য। আসামের শিলচরে ভট্টাচার্যের বাড়িই তার সঙ্গীত জীবনের প্রাথমিক অংশ। তিনি তাল এবং সুরের মধ্যেই বেড়ে উঠছিলেন। তবলা বাজানোর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে তিনি সুরের জগতে প্রবেশ করেন। তবলার পরে ধাপে ধাপে অন্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো শেখেন। তিনি কণ্ঠ্য সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বিভিন্ন গুরুর কাছ থেকে। গান তাঁর গভীর আগ্রহের বিষয় ছিল। অবশেষে তিনি বাংলার এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন। এরপরেই ঐতিহ্যবাহী লোকের গানের সন্ধান শুরু করে যা স্পন্দনশীল, সুমধুর এবং সর্বজনীন লোক সুর, যা ছিল অনেকের অচেনা এবং অজ্ঞাত। ১৯৯৫ সালে তিনি তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে "India foundation for the arts" থেকে ‘লোক সঙ্গীতের’ উপর গবেষণা করার জন্য অনুদান পেয়ে ব্যাঙ্গালোরে চলে যান। দোহার ব্যান্ড পড়াশোনা চলাকালীন সময়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই পল্লী গান আর মেঠো সঙ্গীতকে নিয়েই নতুন ঘরানার একটি ব্যান্ড তৈরি করবেন। ১৯৯৯ সালে তিনি বাংলার লোকগান এবং পল্লী সঙ্গীতের পুনর্জাগরণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘দোহার ব্যান্ড’। খুব কম সময়ের মধ্যেই দোহার ব্যান্ডের গান পৌঁছে বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে সমস্ত গান গুলি হারিয়ে গিয়েছিল সেই সমস্ত গানগুলিকে তিনি আবার নতুন মোড়কে পেশ করলেন শ্রোতাদের সামনে। সিলেট অঞ্চলের সিলেটি গান, অসমের বিহু গান, কামরূপী‚ ভাওয়াইয়া গান তিনি দেশে-বিদেশে গেয়েছিলেন। এর পাশাপাশি লালন সাঁই, রবীন্দ্রনাথ, আব্বাসউদ্দিন সহ আরও অনেকের গান তিনি গেয়েছেন। যা সত্যিই মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছিল খুব অল্প দিনেই। দোহার এর উপস্থাপনা ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। এই গানগুলো একই সাথে গবেষণা এবং বিনোদনের আকর ছিল। দোহার ইতোমধ্যে কনকর্ড রেকর্ড থেকে কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের পরিচালিত লোক গানের নয়টি অ্যালবাম প্রকাশ করেছে। কালিকাপ্রসাদের মিউজিক্যাল ক্যারিয়ার কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্রে কয়েকটি প্লেব্যাক গান গেয়েছিলেন। অশোক বিশ্বনাথের পরিচালিত হিন্দি চলচ্চিত্রে ‘গুমশূদা’ ছবিতে তাঁর গান ছিল। ২০০৭ সালে তিনি সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র চতুরঙ্গের জন্য গান গেয়েছিলেন। ২০০৮ সালে, তিনি বাংলা চলচ্চিত্র মনের মানুষ (সোনালি ময়ূর পুরস্কার বিজয়ী) এর জন্য গান গেয়েছিলেন। এই ছবিটি ছিল বিখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ এর পরিচালিত ভারত-বাংলাদেশের একটি যৌথ প্রকল্প। এটি ফকির লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন নিয়ে সুনিল গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র। বাংলা চলচ্চিত্র ‘জাতিশ্বর’ একটি জাতীয় পুরস্কার (রজত কামাল) বিজয়ী চলচ্চিত্র ছিল। এই ছবিটি শ্রীজিত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালিত চলচ্চিত্র ছিল। এই ছবিতেও কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ২০১৪ সালে গান গেয়েছিলেন। ২০১২ সালে কালিকাপ্রসাদর গবেষণামূলক নিবন্ধ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নাল ও নিউজ পেপারে প্রকাশিত হয়। তবে শুধুই দোহার নয়, লোকসঙ্গীত জগতে কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য এক অন্যমাত্রা যোগ করেছিলেন। হারিয়ে যাওয়া বাংলার লোকসঙ্গীতকে মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছতে সচেষ্ট হয়েছিলেন এই শিল্পী। শুরু করেছিলেন বাংলার লোকসঙ্গীত নিয়ে গবেষণা। গানের সুরেই মানুষকে পৌঁছে দিতেন বাংলার বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এককথায় তিনি ছিলেন খাঁটি বাঙালি। মাটির সোঁদা গন্ধ মাখা লোকসঙ্গীত দিয়েই দুই বাংলাকে জুড়েছিলেন সকলের প্রিয় কালিকাপ্রসাদ। ২০১৭ সালে কালিকাপ্রসাদের উদ্যোগে জি বাংলার 'সা রে গা মা পা'-র মতো রিয়েলিটি শোয়েও লোকসঙ্গীতকে অন্যমাত্রায় তুলে ধরেছিলেন এই শিল্পী। ২০১৭ সালেই দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় তৈরি 'ভুবনমাঝি' ছবিতে সঙ্গীত পরিচালকের ভূমিকায় কাজও করেছিলেন কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য। কর্মজীবনের শুরুর দিকে একটি রেডিও চ্যানেলেও তিনি কাজ করেছেন। প্রচুর পুরস্কার এবং সম্মাননা তিনি পেয়েছেন। মৃত্যু ২০১৭ সালের ৭ মার্চ, মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে হুগলির গুড়াপের কাছে পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কালিকা ভট্টাচার্য। বীরভূমে একটি গানের অনুষ্ঠান সেরে জাতীয় সড়ক ২ ধরে ফিরছিলেন কালিকা ও তাঁর দল। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়াছবি সৌজন্যেঃ বর্ধমান ডট কম।