লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা পোট্রেট মোনালিসা সম্ভবত বিশ্বের সবেচেয়ে বেশী আলোচিত চিত্রকর্ম। শুধু তাই নয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশী দামী শিল্পকর্ম এবং রহস্যে ভরা। একজন শিল্পী টানা ১৪ বছর ধরে শুধু একটি ছবিই এঁকে চলেছেন। শুধু তাই নয়, মোনালিসার ঠোঁট শুধু আঁকতে সময় নিয়েছিলেন ১২ বছর। এখনও এই ছবির প্রেমে পড়ে আত্মহত্যা করে মানুষ। অ্যাসিড হামলা থেকে শুরু করে একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে এই ছবির মোনালিসার উপর। চুরিও যায় এই পোট্রেট। এক রহস্যময় জাদু এই ছবিকে ঘিরে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় মোনালিসা হাসছে। কাছে যেতেই সেই হাসি মিলিয়ে যায়। আরও কত রহস্য। মোনালিসার ইতিহাস পাঁচশ বছর আগে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা পোট্রেট মোনালিসা সম্ভবত বিশ্বের সবেচেয়ে আলোচিত চিত্রকর্ম। ফ্রান্সের ল্যুভ মিউজিয়ামে এখনও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শুধু মোনালিসার রহস্যময় হাসি দেখতে আসেন। কয়েক শ বছর ধরে মানুষ কম-বেশি বিশ্বাস করে আসছে দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা ফ্লোরেন্সের তৎকালীন একজন সিল্ক ব্যবসায়ীর স্ত্রী লিসা গেরারদিনির প্রোট্রেট।তবে ফ্রান্সের একজন গবেষক গত দশ বছর ধরে গবেষণার পর বলছেন, প্রোট্রেটের রহস্যময়ী এই নারী অন্য কেউ ছিলেন। আর এই তত্ত্ব নিয়ে শিল্পী মহলে শুরু হয়েছে তোলপাড়। দ্য ভিঞ্চি মোনা লিসার পোট্রেটটি নিয়ে কাজ করেছিলেন ১৫০৩ সাল থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত। মতান্তরে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৫০৩ থেকে ১৫০৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে এই ছবিটি আঁকেন। তবে ১৫০৩-১৫১৭ সময়কালকেই বেশীরভাগ গবেষক মেনে নিয়েছেন। ছবিটি আঁকতে শুরু করেছিলেন ইটালির ফ্লোরেন্সে। এরপর ফ্রান্সের রাজার আমন্ত্রণে লিওনার্দো ছবিটি নিয়ে হাজির হন ফ্রান্সে। লিওনার্দো এবং মোনালিসা মোনালিসা ছবিটি সম্পর্কে রহস্য ভেদ করতে গেলে প্রথমে শৈল্পীক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ছবিটি কে দেখতে হবে, জানতে হবে তার জীবন সম্পর্কে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির পুরো নাম ‘লিওনার্দো দি সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি’। ১৫ই এপ্রিল ১৪৫২ সালে ইতালিতে এই শিল্পীর জন্ম। লিওনার্দোর পিতা প্রথম থেকেই ছেলের শিল্পের প্রতি আকর্ষণ ও প্রতিভাকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি লিওনার্দোকে চিত্রশিল্প নিয়ে পড়াশোনা করানোর জন্য প্যারিসে পাঠিয়ে দেন। সেখানে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন এন্ড্রিও ডেল ভেরুচ্চির কাছে। সেখানেই শিল্পকলা নিয়ে সমস্ত কিছু নিখুঁতভাবে শেখেন যা তার শিল্পকলা তে ফুটে উঠতে থাকে। মনে করা হয় মোনালিসা ছবিটি মোনালিসার দ্বিতীয় পুত্র সন্তানের জন্ম গ্রহণের সময়ে আঁকা হয়। অনেকে শিল্প গবেষক রহস্যময় হাসির এই নারীকে ফ্লোরেনটাইনের বনিক ফ্রানসিসকো দ্যা গিওকান্ডোর স্ত্রী লিসা গেরাদিনি বলে শনাক্ত করেছেন। কেউ কেউ বলেন এই পোট্রেটটি উনার মায়ের। আবার অনেকের মতে এটি তার কল্পনা থেকে আঁকা। আবার কেউ কেউ মনে করেন মোনা লিসা হলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বান্ধবী। তবে সাম্প্রতিক এক কম্পিউটার পরীক্ষায় দেখা গেছে মোনা লিসা'র সাথে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির কিছুটা মিল রয়েছে। তাই মনে করা হয় হয়তো মোনা লিসা চিত্র কর্মটি না ছেলে না মেয়ে। এটি শিল্পীর নিজেরই নারী অবয়ব। আজও জানা যায়নি আসলে মোনালিসা কে। মোনালিসা কার পোট্রেট? কিন্তু ভিঞ্চি আসলে কার পোট্রেট তৈরি করেছিলেন সেই প্রশ্ন মোনালিসার হাসির মতই রহস্য মোরা। তবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে ব্যাখ্যা তা হলো পোট্রেটের এই নারী ফ্লোরেন্সের তৎকালীন একজন সিল্ক ব্যাসায়ীর স্ত্রী লিসা গেরারদিনির। কিন্তু সেই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন প্যারিসের একজন বিজ্ঞানী পাসকাল কোট। ২০০৪ সালে ল্যুভ কর্তৃপক্ষ তাকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে এই পোট্রেটের ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়। তারপর এত বছর ধরে বিশেষ আলো এবং লেন্সের প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার পর এই বিজ্ঞানী বলছেন, পোট্রেটের নারী, লিসা গেরারদিনি নন, তিনি অন্য কেউ। পাসকাল কোট বলছেন, তিনি ক্যানভাসের মোনালিসার পেছনে তিনটি আলাদা আলাদা ইমেজ খুঁজে পেয়েছেন। তৃতীয় যে ইমেজটি তিনি খুঁজে পাচ্ছেন সেটি অন্য এক নারীর মুখ, তার ঠোঁটে কোনো হাসি নেই। এই বিজ্ঞানী একরকম নিশ্চিত ক্যানভাসে খালি চোখে না দেখতে পাওয়া সেই মুখই লিসা গেরারদিনির। দশ বছর আগ পর্যন্ত এটা কল্পনা করাই কঠিন ছিল, এই পোট্রেটের ক্যানভাসে এতোগুলি ধাপ ছিল। সবাই জানতো এই পোট্রেটটি একবারেই করা। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে লিসা গেরারদিনির প্রোট্রেট কি পরে বদল করেছিলেন দ্য ভিঞ্চি? এখনকার চিত্রটি কি অন্য কোনো নারীর? পেইন্টিংয়ের ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু গ্রায়াম ডিক্সন বলছিলেন, ‘’পাসকাল কোটের এই তত্ত্ব গত একশ বছরে শিল্প জগতের সবচেয়ে সাড়া জাগানো খবর। মোনালিসা সম্পর্কে আমরা এতদিন ধরে যা বিশ্বাস করতাম, তাতে বড় ধরণের ঘা পড়েছে। আমি অন্তত এখন আর বলবো না যে ছবির ঐ নারী মোনালিসা। বরঞ্চ অন্য কেউ।'' তবে লিওনার্দো নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন, তাদের অনেকেই নতুন এই তত্ত্বকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নন। অক্সফোর্ড বিশ্ব বিদ্যালয়ের আর্ট হিস্ট্রির অধ্যাপক মার্টিন কেম্প মানতে রাজি নন দ্য ভিঞ্চি, লিসা গেরারদিনির মুখের ওপর দিয়ে পরে অন্য কোন নারীকে এঁকেছিলেন। পাসকাল যে সব গবেষণা তথ্য হাজির করেছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাসকাল তার গবেষণায় দেখেছেন ছবিটি আঁকার বিভিন্ন পর্যায়ে লিওনার্দো কী কী ভেবেছেন, কিভাবে এগিয়েছেন। মোনালিসা নিয়ে বিজ্ঞানী পাসকাল কোটের সাড়া জাগানো এই তত্ত্ব নিয়ে ল্যুভ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ কোনা মন্তব্য করতে রাজি হননি। মোনালিসা ছবিটির মূল্য ১৫০৩ থেকে ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ইতালির বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি মোনালিসা ছবিটি এঁকেছিলেন, এটি তার অসামান্য কীর্তি। পাইন কাঠের টুকরোর ওপর অঙ্কিত মোনালিসা ছবিটির মূল্য ৮৩০,০০০,০০০ মিলিয়ন ডলার যা ভারতীয় টাকায় ৫৭,১২,০০,০০,০০০ কোটি টাকা। ছবিটি এত মূল্যবান হওয়ার পিছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে, ছবিটিতে লুকানো রয়েছে অনেক রহস্য যা আজ পর্যন্ত পুরোপুরি জানা সম্ভব হয়নি। মোনালিসা ছবির রহস্য মোনালিসা ছবির রহস্য গুলি সম্পর্কে এবার জানা যাক। ছবিটি দেখে অনেকেই বলেছেন এখানে হাস্যময়ী এক নারীকে দেখা যাচ্ছে আবার অনেকে তার দুঃখে ভরা মুখটি দেখতে পেয়েছেন। অনেকে এটাও বলেছেন ছবিটি এক এক দিক থেকে এক এক রকম দেখতে বলে মনে হয়, এর আসল কারণ কি তা কেউই জানেন না। ৫১ বছর বয়সে তিনি এটা তৈরি করা শুরু করেন এবং প্রায় ১৬ বছর ধরে এটি তৈরি করেন শুধুমাত্র ঠোঁট আঁকতে নাকি শিল্পীর সময় লেগে যায় প্রায় ১২ বছর। তবুও তিনি এটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি, গবেষকদের বারবার গবেষণার পরও জানা যায়নি এর কোন অংশের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। মোনালিসার ছবিটি ফ্রান্সের ল্যুভ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। ২১শে আগস্ট ১৯১১ সালে এটি চুরি হয়ে যায়। জাদুঘরেরই এক কর্মচারী ভিনসেঞ্জু পেরুগিয়া এটি চুরি করে। কোটের ভেতর ঢুকিয়ে ছবিটি নিয়ে চলে যান। তারপর এটি আবার উদ্ধার হয় ইতালি থেকে এবং এটির রক্ষণাবেক্ষণ করাটা আরো জরুরি হয়ে পড়ে। রহস্যময় মোনালিসার ছবিটির আরেকটি অংশ সকলেই লক্ষ্য করেছেন, এটি হলো তাঁর চোখের ‘ভ্রূ’। ছবিটিতে কোন ‘ভ্রূ‘ না থাকা সত্ত্বেও ছবিটির সৌন্দর্যে কোন রকম প্রভাব ফেলেনি। অনেকেই মনে করেন লিওনার্দো ভ্রু এঁকে ছিলেন, কিন্তু একাধিকবার ছবিটি পরিচর্যার জন্য তা মুছে যায়। আবার অনেক গবেষকের মতে লিওনার্দোর নিজেরই মহিলা প্রতিকৃতি এটি। মোনালিসার চোখের একাধিকবার যাচাই করার ফলে দেখা গেছে সেখানে লেখা রয়েছে ‘L V’ এই শব্দটি, যা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কেই নির্দেশ করে। ছবিটির আরেকটি বিশেষত্ব হলো এটি কে দূর থেকে দেখলে মনে হয় এটি হাসছে এবং কাছে আসলে দেখা যায় হাসিটি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন ছবিটি ৩০টি লেয়ার বিশিষ্ট, যা একেবারেই নিখুঁত ও চমকপ্রদ। একটি প্যারানরমাল এক্টিভিটি নিয়ে গবেষণা করা ওয়েবসাইট প্যারানরমাল ক্রুসাইবেল জানিয়েছেন ছবিটিকে যখন আয়নার পাশাপাশি রাখা হয় তখন সেখানে একটি ভিনগ্রহের প্রাণীর দেখা যায়। যা অবিশ্বাস্য হলেও তথ্যটি কে একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। অনেকবার হামলা হয়েছে এই ছবিটির উপর। এমনকি অ্যাসিড হামলাও হয়েছিল। তাই মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ এখন বুলেট প্রুফ কাচের ভেতর রেখেছে ছবিটিকে। একবার এক মহিলা এই ছবিটির উপর কিছু একটা ছুঁড়ে মেরেছিল। এরপর এই ছবিটির হাতের কনুইয়ের দিকে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। পড়ে সেই আঘাত সারিয়ে নেয়ার চেষ্টা হলেও এখনও সেই দাগ রয়ে গেছে। এই ছবিটিকে পূর্বে রাজা বাদশারা তাদের শয়নকক্ষে এবং পরবর্তীতে স্নানাগারে রেখেছিলেন। ছবিটিতে একটা তুলির টান পর্যন্ত দেখা যায়না। এক মোনালিসা প্রেমিক এই ছবিটি দেখে এতোটাই পাগল হয়ে যান যে, আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসেন। এখনও মোনালিসা মানেই রহস্য়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, চিত্রনন্দন, ঋতীশ রঞ্জন চক্রবর্তী।ছবি সৌজন্যে: উইকিপিডিয়া