প্রায় ১৪ কোটি বছর আগে অতিকায় ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত পৃথিবীর বুকে। এই ডাইনোসরের সাথে নোবেল পুরষ্কার প্রাপক রবীন্দ্রনাথের বা বিজ্ঞানী প্রশান্ত মহালানবীশের কি সম্পর্ক? আছে গভীর সম্পর্ক। কিন্ত কিভাবে তাদের সৃষ্টি হলো, কিভাবে বেঁচে ছিল ডাইনোসর, কেনইবা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হলো, এইসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। তবু চেষ্টা চলছে। কেউ কেউ ২৫-২৯ আগস্ট ডাইনোসর সপ্তাহ উদযাপন করছে। ডাইনোসরকে নিয়ে এখনও অনেক অজানা তথ্য আমাদের রহস্যকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ‘ডাইনোসর’ শব্দের অর্থ ডাইনোসরের নামকরণ কিন্তু এমন সব সাধারণ শব্দ দিয়েই করা হয়ে থাকে। যেমন, ‘ডাইনোসর’ শব্দের অর্থ হলো ‘ভীষণাকৃতি টিকটিকি’। আধুনিককালে সুপার ক্রক (Super Croc) শব্দটি বহুল পরিচিত। তবে এতদিন বিভিন্ন বিদেশী ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছিল। ১৯৬০-৬১ সালে বাঙালি বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ডাইনোসরের প্রথম বাঙলা নাম দেয়া হলো বাঙালি কবি এবং ভাষায়, ‘বড়-পা-সরাস টেগোরি’। একটি আস্ত ডাইনোসরের কঙ্কালের সাথে নাম জুড়ে গেলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং বাঙালির বাংলা ভাষা। শুধু তাই নয়, এই প্রথম কোন ভারতীয় তথা বাঙলা ভাষায় নাম দেওয়া হলো ডাইনোসরের। ডাইনোসর চুরি একটা মজার ঘটনা বলি, ২০০৩ সালের জুলাই মাসে অস্ট্রেলিয়ায়, সিডনির এক জাদুঘর থেকে চুরি যায় চিন থেকে প্রদর্শনীর জন্যে নিয়ে আসা ডাইনোসরের ফসিল। বিভিন্ন সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাপাও হয়েছিল সেই ডাইনোসর চুরি যাওয়ার খবর। এনিয়ে ধুন্দুমার কান্ড ঘটে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ভারতবর্ষে ডাইনোসর কিন্তু এই ভারতবর্ষেই রয়েছে ডাইনোসরের ফসিল হয়ে যাওয়া সত্যিকারের কঙ্কাল। আর এই কঙ্কাল রয়েছে কলকাতার বনহুগলিতে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট এর ভূতত্ব বিভাগে। ১২ ফুট উঁচু এবং ৪৭ ফুট লম্বা এই কঙ্কালের মালিক ডাইনোসরটি আজ থেকে প্রায় ১৮ কোটি বছর আগে এই ভারতবর্ষেই বিচরণ করতো। তখন এই ডাইনোসরটিকে নাম ধরে ডাকার কেউ ছিলনা। কিন্তু ভারতীয় বিজ্ঞানীরাই এই ডাইনোসরটিকে খুঁজে বেড় করে নাম দিয়েছে, ‘বড়পাসরাস টেগোরি’ (Barapasaurus tagorii)। ‘বড়পাসরাস টেগোরি’ আবিস্কার বর্তমানে মহারাষ্ট্রের গড়চিরুলি জেলার একটি গ্রামের নাম পুচমপল্লি। জায়গাটা মহারাষ্ট্রের হলেও অন্ধ্রপ্রদেশের সিমান্তে অবস্থিত। সেখানে গোদাবরী নদীর উপত্যকায় কয়েক দশক আগে এক অত্যাশ্চর্য আবিস্কার করেছিলেন তিন ভারতীয় বিজ্ঞানী। উনারা হলেন, এস এল জৈন, তপন রায়চৌধুরী এবং শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। এই বৈজ্ঞানিক দলের নেত্রী ছিলেন পুরাজীববিদ পামেলা রবিনসন। প্রায় তিনশ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে চুনযুক্ত কাঁদা পাথরের মধ্যে তারা কোটি কোটি বছরের পুরনো হাড়ের নমুনা খুঁজে পেয়েছিলেন। তখন জায়গাটা ছিল চন্দ্রপুর জেলার অন্তর্গত। স্থানীয় চাষিরা, বিরাট এক পাথরের চাই খেতের আড়ালে বাঁধার কাজে ব্যবহার করছিল। কাদামাটির প্রলেপ সরানোর পরে দেখা গেল, ওটা আসলে ডাইনোসরের পায়ের একটা হাড়। চার ফুটেরও বেশী লম্বা। বিজ্ঞানীদের সহযোগী এবং গাড়ির চালক বিস্ময়ে বলে উঠেছিল, ‘এতো বড় পা!’ শেষপর্যন্ত আবিষ্কৃত হলো জুরাসিক যুগের এমন এক নিরামিষাশী ডাইনোসরের কঙ্কাল, যার অস্তিত্বের কথা কেউ আগে জানত না। এই ডাইনোসরের বিশিষ্ট এর চারটি বিশালাকার পা। তার সাথে গাড়িচালকের বিস্ময় এতো মানানসই হল যে, বাঙালি বিজ্ঞানীরা এর নাম দিলেন, ‘বড়পাসরাস’। এই আবিস্কার হয়েছিল ১৯৬০-৬১ সালে। সেই বছরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পূর্তি উৎসব চলছে। সেই আবেগকে স্থায়ী রুপ দিতে ডাইনোসরটির সম্পূর্ণ নাম দেয়া হলো, ‘বড়-পা-সরাস টেগোরি’। ভাবা যায় একটি আস্ত ডাইনোসরের কঙ্কালের সাথে নাম জুড়ে গেলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের! পাথর হয়ে যাওয়া অসংখ্য হাড়ের টুকরো জুড়ে গোটা কঙ্কালের কাঠামোটি আস্তে আস্তে তৈরি করা হলো। সব হাড় অবশ্য পাওয়া যায়নি। কিছু কিছু অংশ তৈরি করতে হলো কৃত্রিমভাবে। সব মিলে কোটি কোটি বছর বাদে আবার উঠে দাঁড়ালো এই সরীসৃপ দৈত্য। ১৯৭৭ সালে তাকে রাখা হলো, বিজ্ঞানী প্রশান্তচন্দ্র মহালানবীশ প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট’ বা আই এস আই-এর জিওলজিক্যল মিউজিয়ামে। কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ইতিহাস যে ধরে রেখেছিল, আশা করা যায় এই দুই ভারতীয় মনীষীর স্মৃতি সে আরও বহুদিন বহন করবে। প্রশান্ত মহালানবীশ মহালানবীশ নিজেই আই এস আই-তে ভূতত্ববিদ্যার গবেষণার সুত্রপাত করেছিলেন। ভূবিজ্ঞানী পামেলা রবিনসনকে তিনি আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন এখানে। রবিনসনেরই ছাত্র বা গবেষকরা বড়পাসরাস টেগোরি’র আবিস্কারের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের অধিকারী। এই আবিস্কার শুধু একটি ডাইনোসরকে খুঁজে পেয়েছে তাই নয়, এর মাধ্যমে এক মিসিং লিঙ্ক এর সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘পুরাজীববিদ্যা’ বা Palaeontology এবং ডাইনোসর এর আবির্ভাব প্রাগৈতিহাসিক জীব সম্বন্ধে অধ্যায়নকে ‘পুরাজীববিদ্যা’ বা Palaeontology বলা হয়। সেই অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হওয়ার পরবর্তী সময়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পৃথিবীতে ডাইনোসর আসে ‘মেসোজায়িক’ (Mesozoic) যুগে। যার সুত্রপাত প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে। প্রথমদিকে বলা হয়, ‘ট্রায়াসিক’ (Triassic) যুগ, যখন সবে উভচর প্রাণী থেকে সরীসৃপের বিকাশ ঘটেছে। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯ থেকে ১৪ কোটি বছর সময়সীমাকে বলা হয় ‘জুরাসিক’ (Jurassic) যুগ। এই নামটি বিখ্যাত ছবি জুরাসিক পার্কের কারনে আমাদের খুব পরিচিত। এই সময়েই ডাইনোসরের খুব বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। অতিকায় নিরামিষাশী ব্রন্টোসরাস, ডিপ্লোডকাস, ট্রাইসেরাটপস যেমন ছিল, তেমনি দৈত্যাকৃতি মাংসাশী টিরানোসরাস, অ্যালোসরাসও ছিল। এই জাতীয় বিবর্তনের ইতিহাসে ধারাবাহিকতার হিসাব সবসময় বজায় থাকেনা। সেরকমই এক বিচ্ছিন্ন সুত্র জোড়া লেগেছে এই বড়পাসরাসের খোঁজ পাওয়াতে। পরবর্তী কালের ডাইনোসরাসদের বিকাশের পূর্ববর্তী অবস্থার হিসাব পাওয়া গেছে। কেমন ছিল বড়পাসরাস? বিশাল বড়পাসরাসের পা গুলি ছিল বিশালকায়। দীর্ঘ আর মজবুত। গলা আর লেজ দুই-ই খুব লম্বা। এরা জিরাফের মতো এতোটা মাথা তুলতে পারতো না। গাছ বা গুল্মের পাতা খেয়েই জীবন ধারণ করতো। তাই নিরামিষাশী হলেও এরা ঠিক তৃণভোজী নয়, গুল্মভোজী। অন্যদিকে মাংসাশী হিংস্র ডাইনোসরদের কথা একবার যদি ভাবি তাহলে কিন্তু মাথা ঘুরে যাবে। ফসিলস হয়েই তারা ভয়ানক। আজ থেকে ২৩ কোটি বছর আগেকার এক ‘ভীষণাকৃতি টিকটিকি’ কতটা ভয়ানক হতে পারে তা আন্দাজ করাও কঠিন। তবে ডাইনোসর মানেই ইতিহাস। ডাইনোসর মানেই বিজ্ঞানের এক অত্যাশ্চর্য আবিস্কার। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, প্রশান্ত মহালানবীশ এবং ডাইনোসরের এই কম্বিনেশান খুব রেয়ার। অবলুপ্তি ৬·৬ কোটি বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগের শেষভাগে সংঘটিত ক্রিটেশিয়াস-প্যালিওজিন অবলুপ্তি ঘটনা অধিকাংশ ডাইনোসরের বিলুপ্তি ঘটায়। কেবল যে শাখাটি থেকে ইতোমধ্যেই প্রথম পাখিদের বিবর্তন হয়েছিল তারা আজ পর্যন্ত টিকে আছে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উদ্বোধন