দরজায় কড়া নাড়ছে বৈশাখ। বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা একটি উৎসব এটি চৈত্র সংক্রান্তি। বিংশ শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি সারিয়েছিলেন পঞ্চতিক্ত পাঁচন দিয়ে। একবিংশ শতাব্দীর কোভিড অতিমারি প্রতিরোধেও রবীন্দ্রনাথের এই কবিরাজি ফর্মুলার কথা কিন্তু বারবার উঠে এসেছে বিশেষজ্ঞদের মাথায়। পাঁচন কি? বৈশাখ উপলক্ষে চৈত্র সংক্রান্তি অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিন সব ধরনের সবজি দিয়ে একটি বিশেষ নিরামিষ তরকারি রান্না করা হয় বাংলায়। আঞ্চলিক ভাষায় একে ‘পাচন’ বলা হয়। বাঙালি এবং নৃতাত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পাচন খাওয়ার রেওয়াজ বেশ পুরোনো। পাহাড়ের আদি বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে চলে পাচন খাওয়ার উৎসব। সমতলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আগে পাচন খাওয়ার প্রচলন থাকলেও এখন ধীরে ধীরে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষ সবার ঘরেই রান্না হচ্ছে পাচন। প্রচলিত রয়েছে ১০৮ ধরনের সবজি দিয়ে এই পাঁচন রান্না করা হয়। আঞ্চলিক ভাষায় একে ‘আঠোরা’ও বলা হয়। রবীন্দ্রনাথ এই পাঁচন তৈরি করে প্রত্যেক আশ্রমবাসীকে নিয়ম করে খাওয়াতেন এবং সে সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি আটকেছিলেন। সবাই জানি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ হোমিওপ্যাথির চিকিৎসায় বেশ পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু পাচনের আবিস্কার কিন্তু সত্যিই অভাবনীয়। রবীন্দ্রনাথের পঞ্চতিক্ত পাঁচন তেউরি, নিম, গুলঞ্চ, নিশিন্দা এবং থানকুনি বেটে একসঙ্গে সবটা মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এই পাঁচন। রবীন্দ্রনাথ এই পাঁচন তৈরি করে প্রত্যেক আশ্রমবাসীকে নিয়ম করে খাওয়াতেন এবং সে সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো মহামারি দেখা দিয়েছিল। তিনি সেই মহামারীকে আটকে দিয়েছিলেন। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সীতা দেবীর ‘পুণ্য স্মৃতি’ থেকে জানা যায়, দেশে জ্বরের মহামারির ছোঁয়া আশ্রমের বহু ছাত্রছাত্রীর উপর এসে পড়ে। তারা অসুস্থ হয়ে যায়। সীতা দেবীর লেখা থেকেই জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজে রোজ ঘুরে ঘুরে প্রত্যেক অসুস্থ ছাত্রছাত্রীকে দেখতে যেতেন। তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতেন। এমনকি চিকিৎসাও করতেন। সীতা দেবী লিখছেন, ‘সে বার তিনি একটি ভেষজ প্রতিষেধক তৈরি করলেন। সেই প্রতিষেধকটির নাম ‘পঞ্চতিক্ত পাঁচন’। রবীন্দ্রনাথ চিকিৎসক দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রকে ১৯১৮-র ২৯ ডিসেম্বর একটি চিঠিতে লিখছেন, ‘ছাত্ররা সৌভাগ্যক্রমে সকলেই ভাল আছে। তাদের সকলকেই রোজ পঞ্চতিক্ত পাঁচন খাওয়াই। আমার বিশ্বাস সেই জন্য তাদের মধ্যে একটি কেস (Case) ও হয়নি, অথচ তারা অধিকাংশই সংক্রামকের কেন্দ্র থেকে এবং রোগগ্রস্ত পরিবার থেকে এসেছে।’ পরবর্তী সময়ে বিশেষজ্ঞরা রবীন্দ্রনাথের এই পঞ্চতিক্ত পাঁচনের উপাদানগুলি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখেন, তেউরি, নিম, নিসিন্দা— এই তিন উপাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরীরের জন্য। কারণ তা শ্বাসজনিত রোগ আর ম্যালেরিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে পারে। রবীন্দ্রনাথের এই পাঁচন যে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো ভাইরাসের সঙ্গে লড়েছিল তার বহু প্রমাণ রয়েছে। কোভিডে রবীন্দ্রনাথের পঞ্চতিক্ত পাঁচন আয়ুর্বেদ এবং অ্যালোপ্যাথ বিশেষজ্ঞ দের কথায়, কোভিড-১৯ মহামারীকালে বা করোনাভাইরাস প্রতিরোধকারী সরাসরি কোনও মেডিসিন এখনও নেই। কোনও অ্যান্টিডোটও নেই। তাই চিকিৎসার মাধ্যমে আমরা শরীরে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছি যাতে এই ভাইরাস বেশি ক্ষণ টিকে থাকতে না পারে। এ ক্ষেত্রে অ্যালোপ্যাথি মেডিসিন যে ভাবে কাজ করছে ঠিক সেই রকম ভাবে এজ ওল্ড আয়ুর্বেদের ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের যে পঞ্চতিক্ত পাঁচন তার অনেক গুণ আছে। নিম যেমন অ্যান্টি ইনফেক্টিভ। নিম খাই, লাগাই। এগুলো সরাসরি অ্যান্টি ভাইরাল না হলেও ভাইরাস যে পরিবেশ পছন্দ করে সেগুলো নষ্ট করে দেওয়ার জন্য এগুলোর অবদান অনস্বীকার্য।’’ রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট পাঁচনকে এভাবেই কিন্তু মান্যতা দিচ্ছেন এই সময়ের অ্যালোপ্যাথ চিকিৎসকরাও। প্রচলিত আছে, এই পাঁচন রান্না করতে হয় ১০৮ ধরনের সবজি দিয়ে। এজন্য আঞ্চলিক ভাষায় ‘আঠোরা’ও বলা হয়। ১০৮ রকমের পদ বলা হলেও পাঁচনে যত বেশি পদ ব্যবহার করা যায়, ততই সুস্বাদু হয়। এজন্য এখন সবজির সঙ্গে গ্রামের শাকও মানুষ দিচ্ছে পাঁচন রান্নায়। এছাড়া কাট্টুস (আঞ্চলিক নাম), কাঁচা কাঠাল, তারা, ডুমুর, তিতা বেগুন, কলার খাড়া (কলাগাছের ভেতরের কাণ্ড), গিমাশাক, কাঁচা আম, কাঁচা কলা, মূলা, পটল, গাজর, লাউ, তিতা করলা, টমেটো, কাঁকরোল, বরবটি, ঢেঁড়স, কচুর ছড়া, পেঁপে, মিষ্টিকুমরো, শালবন, শসা, চালকুমড়া, আলুসহ বারোমাসী বিভিন্ন সবজিরও ব্যবহার হয়ে থাকে পাচন রান্নায়। শাকের মধ্যে আছে শাকের মধ্যে লাউ ও মিষ্টি কুমড়োর শাক, কচুর লতি, মারিশ শাক, পুঁই শাক, কলমি শাক ও ঢেঁকি শাক দেয়া হয়। এছাড়া পাচনে দেওয়া হয় বিভিন্ন ধরনের ডাল। মসুর কিংবা খেসারি ডালের বড়া, মটরশুঁটি, শুকনো ফেলন ডাল, শিমের বিচিও ব্যবহৃত হয় পাচনে। তবে কোন কোন অঞ্চলে এই পাঁচন কে আবার ‘এচড় বা ইঁচড়’ ও বলে থাকেন। এই ইঁচড়ে আবার কাঁচা কাঁঠাল এবং আলুর আধিক্যই বেশী থাকে। সঙ্গে ঘি গরমমসলা ইত্যাদি। যা যা প্রয়োজন পটল, আলু, মিষ্টি কুমড়া, শসা, কাঁচা কাঁঠাল, করলা, বটের ফল, কাঁকরোল, ধুন্দুল, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঢেঁকিশাক, তারা ডাঁটা, আদা গুনগুনি শাক, লাউ, বেগুন, চাল কুমড়া ও পেঁপে পরিমাণমতো। পাঁচফোড়ন- ১ চা-চামচ শুকনা মরিচ- ৩টি কাঁচা মরিচ- ৩টি আদা বাটা- ১ চা-চামচ জিরা বাটা- ১ চা-চামচ সরষে বাটা- ১ চা-চামচ। প্রণালী পরিমাণমতো লবণ ও হলুদ গুঁড়া দিয়ে সবজি ভাপে বসান। একটি পাত্রে তেল গরম করে তাতে পাঁচফোড়ন, শুকনো মরিচ, কাঁচা মরিচ, আদা বাটা, জিরা বাটা ও সরষে বাটা দিয়ে সবজিগুলো কষিয়ে নিন। বেশি সময় রাখার দরকার নেই। নামানোর আগে খানিকটা চিনি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গ্রাম পাহাড়ের মহিলাদের যুক্তি হচ্ছে, চৈত্র সংক্রান্তির সময় যেসব সবজি পাওয়া যায় সেগুলো শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই তারা সকালে ঘুম থেকে উঠেই যা কিছু সবুজ শাক সবজি চোখের সামনে দেখেন সব কুড়িয়ে এনে এই পাচন রান্না করেন। হারগেজি ফুল (আঞ্চলিক নাম) বা বিউফুলের মালা গেঁথে নিমপাতাসহ চৈত্র সংক্রান্তির দিন ঘরের দরজার উপরে টাঙানো বাঙালির পুরনো প্রথা। কোন কোন বাড়িতে হয় কাঁচা আমের টক। সব মিলিয়ে খেতে কিন্তু দারুণ এই পাঁচন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ লেখাটি বিভিন্ন ব্যাক্তির সাথে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত