সুর সম্রাজ্ঞী, লতা মঙ্গেশকর। ৯২ বছরেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন লতা মঙ্গেশকর। লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ইন্দোরে (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর একজন মারাঠি ও কোঙ্কিণী সঙ্গীতজ্ঞ এবং মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন। তার মাতা সেবন্তী (পরবর্তীতে নাম পরিবর্তন করে সুধামতি রাখেন) জন্ম গুজরাতে। পাঁচ ভাইবোন। পিতার কাছেই গানের তালিম শুরু। কে এল সায়েগলের গান খুব পছন্দের ছিল। যেদিন শুনলেন সায়েগল প্রয়াত হয়েছেন সেদিনই রেডিও’টি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। প্রথম রেকর্ড এবং শুরুর দিনগুলি সেই রেডিওতেই ১৯৪১ সালে প্রথম দুটি গান রেকর্ড করেন। বাবার মৃত্যুর পর পেশাদারি সঙ্গীত জীবনে পা রাখেন তিনি। ১৩ বছর বয়সে মারাঠি গানের রেকর্ড হয়, কিন্তু সে গান সিনেমা থেকে বাদ যায়। এরপরেই মুম্বাই চলে আসা। সময়টা ১৯৪৫ সাল। তাঁর প্রথম হিন্দি গান মারাঠি 'জগভাউ' নামক ছবিতে। প্রথম হিন্দি গান গেয়েছেন তিনি, হিন্দি চলচ্চিত্র 'আপ কি সেবা মে'। তারপর ১৯৪৮এ তিনি সুযোগ পান প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায়-এর ছবি শহিদ-এ এবং মজবুর সিনেমায় 'দিল মেরা তোড়া' গানে তিনি বিশেষ জনপ্রিয়তা পান। এরপর তো ইতিহাস। প্রায় সত্তর বছর মাতিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বকে উনার গানে। পুরস্কার ও সম্মাননা লতা মঙ্গেশকর তার কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ভারতরত্ন পেয়েছেন ২০০১ সালে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ পেয়েছেন ১৯৯৯ সালে। তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত হয়েছেন ১৯৬৯ সালে। এই সঙ্গীতশিল্পীকে ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাদের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ‘লেজিওঁ দনরের অফিসার’ খেতাব প্রদান করেছে। এছাড়া তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৯ সালে। মহারাষ্ট্র ভূষণ পুরস্কার পান ১৯৯৭ সালে। এনটিআর জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯৯ সালে। জি সিনে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার ১৯৯৯ সালে। এএনআর জাতীয় পুরস্কার ২০০৯ সালে। শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ১৫টি বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ৪টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯৭৪ সালে সব চেয়ে বেশি সংখ্যক গান রেকর্ড করার জন্য ‘গিনেস বুক অফ রেকর্ডে’ তাঁর নাম ওঠে। তাঁকে ১৯৮০ সালে দক্ষিণ আমেরিকার সুরিনামের সাম্মানিক নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৮৭ সালে আমেরিকার সাম্মানিক নাগরিকত্ব পান তিনি। ১৯৯০ সালে পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সাম্মনিক ডক্টরেট প্রদান করা হয়। ১৯৯৬ সালে ভিডিওকন স্ক্রিন লাইফটাইম পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০০ সালে আই আই এফ লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার এরকম আরো বহু পুরস্কার ও সম্মানে তিনি ভূষিত। তিনি ১৯৬৯ সালে শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তী কালে তিনি ১৯৯৩ সালে ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম এচিভমেন্ট এবং ১৯৯৪ ও ২০০৪ সালে দুইবার ফিল্মফেয়ার বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেন। রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সঙ্গীত পরিবেশন ১৯৭৪ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তিনি এক হাজারেরও বেশি ভারতীয় ছবিতে গান করেছেন এবং তার গাওয়া মোট গানের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। এছাড়া ভারতের ৩৬টি আঞ্চলিক ভাষাতে ও বিদেশি ভাষায় গান গাওয়ার একমাত্র রেকর্ডটি লতা মঙ্গেশকরেরই রয়েছে। ছবির জগতে উত্তরণ চোখ বুজে তাঁর কথা ভাবতে গেলে অনবদ্য সুমিষ্ট কণ্ঠ শুধু নয়, মনে ভেসে ওঠে তাঁর সাদা শাড়ি, লাল টিপ, আধিক্য বিবর্জিত স্মিত হাসি। কণ্ঠের চেয়ে কোনো অংশে কম বিশিষ্ট নয় তাঁর এই অনন্য রূপ। নিতান্তই সাদামাটা এই রূপ দিয়েই তিনি চোখ জুড়িয়েছেন, মন কেড়েছেন সারা জীবন। প্রথমবার মঞ্চে গান গেয়ে ২৫ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন লতা। চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পথচলা শুরু অভিনেত্রী হিসাবে, তখন তাঁর বয়স সবে ১৩! গায়িকা হিসাবে প্রথম ব্রেক ছিল মরাঠি ছবি ‘কিতি হাসাল’ (Kiti Hasal)। সেই থেকে ধীরে ধীরে হিন্দি ছবির জগতে তাঁর উত্তরণ। প্রায় সাত দশক লতা মঙ্গেশকরের সুরের মূর্ছনায় বুঁদ থেকেছে গোটা দেশ। নিজের গান শুনতেন না কিন্তু, জানেন কী লতা মঙ্গেশকর নিজের গান নিজেই শুনতেন না। হ্যাঁ একদম ঠিক শুনছেন লতা মঙ্গেশকর নিজেই নিজের গান শুনতে চাইতেন না। কারণ হিসেবে লতা মঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar) ২০২০ সালের একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “না, আমি কখনই আমার গাওয়া গান পরে শুনিনি। শুনলেই মনে হত হাজার একটা ভুল খুঁজে পাচ্ছি, একবার গান রেকর্ড করা হয়ে গেলে আমি আর ফিরে সেই গান শুনতাম না।” লতা পরে আরেকটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমার মনে হয় আমি আমার গান গুলির সঙ্গে আর ভালো কিছু করতে পারতাম।” লতার সংগীতকার ও সুরকারেরা তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে বিভিন্ন সংগীতকার ও সুরকারের তৈরি গান গেয়েছেন লতা ৷ যাঁদের মধ্যে ছিলেন অনিল বিশ্বাস শংকর জয়কিশান, নৌশাদ আলী, শচীন দেব বর্মন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, খৈয়াম, রবি, রোশন, কল্যাণজি-আনন্দজি, মদন মোহন, এবং উষা খান্না প্রমুখ। আবার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মুকেশ মহম্মদ, রফি প্রমুখ গায়কদের সঙ্গেও গান গেয়েছেন তিনি ৷ লতা মঙ্গেশকর মীনা কুমারী থেকে সুচিত্রা সেন। শ্রীদেবী, মাধুরী থেকে কাজল, ঊর্মিলা প্রীতি জিনটা পর্যন্ত নায়িকাদের হয়ে তাঁর কণ্ঠ দিয়েছেন। প্রথম বাংলা গান লতা মঙ্গেশকর বাংলা ভাষায় মোট ১৮৫টি গান গেয়েছেন ৷ ১৯৫৬ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর করা 'প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে' গানের মাধ্যমে বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর হাতেখড়ি। সেই বছরই তিনি ভূপেন হাজারিকার সুর করা 'রঙ্গিলা বাঁশিতে' রেকর্ড করেন। যা ব্যাপক হিট হয় সেই সময়। তবে ২০০০ সাল থেকে লতা মঙ্গেশকর বেশ বেছে বেছে গান গাইতে শুরু করেন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ হিন্দুস্থান টাইমস/ উইকিপিডিয়া/ সাময়িক পত্রপত্রিকা এবং সাক্ষাৎকার।