মশা বাহিত রোগগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক, এ কারণে প্রতিবছর বহু মৃত্যু হয়। ভারতবর্ষে শুধু নয় সারা বিশ্বে শুধু মশার আক্রমণে প্রতিবছর চার লক্ষেরও বেশী মানুষের মৃত্যু হয়। তাই ম্যালেরিয়া মুক্ত বিশ্ব গড়ার টার্গেট নিয়েই এই মশা দিবস পালন করা হয় বিশ্বজুড়ে। বিশ্ব মশা দিবস ২০২১-এর থিম ছিল ‘রিচিং দ্য জিরো ম্যালেরিয়া টার্গেট’। ছোট্ট একটা প্রাণী, চোখেও দেখা যায় না সব সময়, কিন্তু আপাতত এই মশার জ্বালাতেই থরহরি কম্পমান আপামর বিশ্ববাসীর। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শিশু আর বয়স্কদের পক্ষে প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়াচ্ছে মশকবাহিত রোগের আক্রমণ। এই অবস্থায় কিভাবে বাড়িটিকে সুরক্ষিত রাখা যায় এনিয়েই এই প্রতিবেদন। চেষ্টা করুন সবার আগে মশারি খাটিয়ে ঘুমোনো। দিনে-রাতে বাইরে বেরনোর আগে ও বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই রেপেলান্ট লাগাতে ভুগবেন না। সেই সঙ্গে কিছু ঘরোয়া টোটকা মেনে চলতে পারেন, তাতেও মশা-মাছি দূরে রাখা সম্ভব। বিশ্ব মশা দিবসের উৎপত্তি ১৮৯৭ সালে ২০ অগস্ট স্যার রোনাল্ড রস আবিষ্কার করেন যে, অ্যানোফিলিস মশাই ম্যালেরিয়া ছড়ায়। অ্যানোফিলিস মশার অন্ত্রে ম্যালেরিয়ার পরজীবী আবিষ্কার করেন তিনি। তাঁকে স্মরণ করে ১৯৩০ সাল থেকে ২০ অগস্ট বিশ্ব মশা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বিশ্ব মশা দিবস ২০২১-এর থিম ছিল ‘রিচিং দ্য জিরো ম্যালেরিয়া টার্গেট’। মশা বাহিত রোগগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক, এ কারণে প্রতিবছর বহু মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর মতে, বিশ্বে প্রতি বছর ম্যালেরিয়ার ২১ কোটি ৯ লক্ষ ঘটনা সামনে আসে। তার মধ্যে মৃত্যু হয় ৪ লক্ষেরও বেশি ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মানুষের। অন্য দিকে ৯.৬ কোটি ডেঙ্গির ঘটনা সামনে আসে, যার মধ্যে ৪০,০০০ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন না। তাই এমন পরিস্থিতিতে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি হয়ে পড়ে। মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বেশী দেখা দেয় বর্ষায় বর্ষাকালের সময় মশাবাহিত রোগশোক গুলি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্ষাকাল মশাদের প্রজননের সময়। অতএব বর্ষার সময় মশার উপদ্রব দেখা যায় বেশি। তাই মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরী- ১. সঠিক পোশাক নির্বাচন করুনঃ বর্ষাকালে বা যে কোনও সময় মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে ফুল স্লিভ জামাকাপড় পরুন। টাইট জামাকাপড় এ সময় না-পড়াই ভালো। আবার ত্বক উন্মুক্ত থাকলে সেখানে মশা কামড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে মসকিউটো রেপেলেন্ট ক্রিম লাগানো যেতে পারে। ২. স্প্রে ব্যবহার করুনঃ মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য কীট স্প্রে ব্যবহার করুন। এছাড়াও প্রাকৃতির উপায় মশা তাড়াতে হলে লেমন বাম, তুলসী, ল্যাভেন্ডার ও মেহেন্দি গাছ বাড়িতে রাখতে পারেন। এ ছাড়াও লেমনগ্রাস, পুদিনা, নীলগিরি এসেনশিয়াল অয়েলও শরীরে লাগাতে পারেন। ৩. বাড়ীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বজায় রাখুনঃ বাড়ির ছাদে, বাগানে বা বাড়ি সংলগ্ন স্থানে জল জমা হতে দেবেন না। কারণ এই জলেই প্রজনন করে মশা। তা ছাড়াও অপ্রয়োজনে দরজা, জানালা খোলা রাখবেন না। ৪. লক্ষণ দেখা দিলে সাবধান হনঃ বর্ষাকালে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। জ্বর, ঠান্ডা লাগা, গাঁটে ব্যথা, বমির মতো লক্ষণ দেখা গেলে একদম দেরী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া ও চিকেনগুনিয়ার মতো রোগ বিপজ্জনক এবং মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। বাড়ি ও তার আশেপাশে কোথাও জল জমতে দেবেন না এ কথা সবাই জানেন যে, বাড়ি বা তার আশেপাশে জল বা আবর্জনা জমতে দেওয়া মানেই মশার বংশবৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়া। তাই কেবল বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই চলবে না, সতর্ক দৃষ্টি রাখুন আশপাশের এলাকার প্রতিও। ঠিকমতো জঞ্জাল পরিষ্কার না হলে পুর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ওভারহেড ও আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাঙ্ক পরিষ্কার রাখুন, তা যেন ঢাকা দেওয়া থাকে। চৌবাচ্চা থাকলে তার উপরেও ঢাকা দিয়ে রাখুন। অ্যাকোয়ারিয়াম বা লিলি পুল আছে বাড়িতে? জল নিয়মিত পরিষ্কার করুন, ছেড়ে রাখুন গাপ্পির মতো মাছ যা মশার লার্ভা খেয়ে নেয়৷ মশা থেকে বাঁচতে কিছু ঘরোয়া উপায় নিম/ সিট্রোনেলা তেল ব্যবহার করুন সিট্রোনেলা তেল কিনতে পাওয়া যায় বাজারে। নিমের তেল ও এক্সট্রা ভার্জিন নারকেল তেল ১:১ অনুপাতে মিশিয়ে রাখুন হাতের কাছে। দরকারমতো স্প্রে করে নিন শরীরের খোলা অংশে। নারকেল আর নিম তেলের মিশ্রণ স্নানের পরেও ব্যবহার করতে পারেন গোটা শরীরে। সিট্রোনেলা তেল মেখেও স্বচ্ছন্দে বাইরে বেরোতে পারবেন, এর প্রাকৃতিক সুগন্ধ আপনাকে ঘিরে রাখবে সারা দিন। এই তেলে ভেজানো ব্যাজও কিনতে পাওয়া যায় আজকাল। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর সময় ইউনিফর্মে লাগিয়ে দিতে পারেন। এডিস মশা দিনের বেলা কামড়ায়, মর্নিং ওয়াকে যাওয়ার সময়ও সাবধানতা অবলম্বন করুন। তুলসী গাছ লাগান অনেকেই বিশ্বাস করে যে বাড়িতে তুলসী গাছ থাকলে নাকি মশা বা মাছি ঘরে ঢুকতে পারে না। ব্যালকনিতে বা জানলার কাছে তুলসী গাছ রেখে দেখতে পারেন। মশা তাড়াতে রসুন কার্যকর কয়েক কোয়া রসুন নিয়ে থেঁতো করে নিন। তার পর সেটা খুব ভালো করে ফুটিয়ে নিন তিন কাপ জলে। জল ফুটে অর্ধেক হলে নামিয়ে ছেঁকে বোতলে ভরে রাখুন। ঠান্ডা হলে ঘরের কোণে কোণে স্প্রে করে দিন এই মিশ্রণ। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), সমসাময়িক পত্রপত্রিকা।