প্রতি বছর ৩রা মার্চ ‘বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস’ বা ‘World Down Syndrome Day’ হিসেবে সারা বিশ্বজুড়ে উদযাপন করা হয়। এই ২০২২ সালে দিবসটির থিম, 'আমার সুযোগ, আমার পছন্দ, চাই সমান অধিকার'। ডাউন সিনড্রোম (Down syndrome) বা ডাউন শিশু হল প্রকৃতির আজব খেয়ালে তৈরি এক বিশেষ ধরনের শিশু। প্রতি ১০০০ শিশুর মধ্যে ১টি শিশু এই রোগে আক্রান্ত - প্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ শিশুর মধ্যে একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে পারে। আমেরিকায় প্রতি বছর প্রায় ৬০০০ ডাউন শিশুর জন্ম হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫০০০ বা প্রতিদিন প্রায় ১৫টি ডাউন শিশুর জন্ম হয়। ডাউন সিনড্রোমের (Down Syndrome) নাম বেশি মানুষ নিশ্চয়ই জানেন না। তবে ভারতে এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়। এ দেশে প্রতি ৮০০ থেকে ১০০০ টি শিশুর মধ্যে ১টি শিশু এই সমস্যা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। এই শিশুদের দেখতে সমান্য আলাদা হয়। এমনকী তাঁদের বুদ্ধি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। এছাড়াও এই রোগে আক্রান্ত শিশুর শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে। তবে সকল ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চারই যে শারীরিক সমস্যা থাকবে, এমনটা কিন্তু নয়। বেশিরভাগ বাচ্চারই স্বাস্থ্যের কোনও সমস্যা হয় না। এই বিষয়টা অবশ্যই অভিভাবকদের মাথায় রাখতে হব। ডাউন সিন্ড্রোম রোগে কোনও বাচ্চা আক্রান্ত হলে তাঁর পরিবারের উপর বজ্রপাত হয় এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাঁরা বুঝতে পারেন, এই বাচ্চাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হতে পারে অনেক কঠিন। ইতিহাস ব্রিটিশ চিকিৎসক জন ল্যাঙ্গডন ডাউন ১৮৬৬ সালে এ শিশুদের চিহ্নিত করেন বলে তাঁর নামানুসারে ডাউন সিনড্রোম কথাটি প্রচলিত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর পূর্বে মানুষ এই রোগটি সম্পর্কে কিছুই জানতো না। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের সারে শহরের একটি মানসিক প্রতিবন্ধী আবাসনের দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক জন ল্যাংডন ডাউন খেয়াল করেন, বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের মধ্যে একাংশ শিশুর চেহারা অন্যদের থেকে একটু আলাদা। তাদের মুখ একটু চ্যাপ্টা এবং ঘাড়টা ছোট। তিনি তাদের নাম 'মোঙ্গলয়েড' রাখেন। এরপর থেকেই এটি ‘ডাউন সিন্ড্রোম’ নামে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্থান পায়। ডাউন স্বতন্ত্র এবং আলাদাভাবে এই রোগের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত ধারনা দেন। এজন্যই তাঁকে ‘ডাউন সিনড্রোমের জনক' বলা হয়। ১৯৫৯ সালে ফ্রান্সের চিকিৎসক জেরমি লিজেউন এই রোগকে ক্রোমোজোমাল ব্যাধি হিসেবে শনাক্ত করেন। ডাউন সিন্ড্রোম কী? ডাউন সিন্ড্রোম জিনগত কারণে সৃষ্ট একটি বংশগত রোগ, যা ক্রোমোজোমের অসংগতির কারণে হয়ে থাকে। আমাদের শরীর গঠনের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশকে কোষ বা সেল (Cell) বলা হয়। প্রতিটি মানব কোষের মধ্যে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম (Chromosome) থাকে, যার অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে আর অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে। কোটি কোটি ডিএনএ (DNA)-এর সমন্বয়ে এক-একটি ক্রোমোজম তৈরি হয়। এই ডিএনএ-কে বলা হয় আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক। অর্থাৎ আমাদের শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমন, আমাদের আচার-আচরণ, বুদ্ধিমত্তা, চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং সবকিছুই এ ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অন্যদিকে মানব শরীরে এই ডিএনএ বা ক্রোমোজমের অসামঞ্জস্য দেখা দিলেই নানারকম শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। যাদের আমরা সাধারণভাবে জন্মগত রোগ বা সমস্যা বা জেনেটিক সমস্যা বলে থাকি। ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু সেরকম একটি জেনেটিক সমস্যায় ভোগা একজন শিশু, যার শরীরের প্রতিটি কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজমটির সঙ্গে আংশিক বা পূর্ণভাবে আর একটি ক্রোমোজম (Trisomy 21) সন্নিবেশিত থাকে। ২১ নম্বর ক্রোমোজম তিনটি থাকে বলে ২১/৩ বা একুশে মার্চ ‘বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস’ পালিত হয়। আর এই অতিরিক্ত ক্রোমোজমটির কারণে ডাউন শিশুর বিশেষ কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। চেহারা একই রকম হয় বলে সহজে ডাউন শিশুদের চেনা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকে ‘ট্রাইজোমি-২১’ বলা হয়। ডাউন সিন্ড্রোমের প্রকার ডাউন সিন্ড্রোমের তিন প্রকার - ১) ট্রাইজোমি-২১ এটি কোষ বিভাজনের অস্বাভাবিকতার কারণে হয়ে থাকে। একে ‘ননডিসজাংশন’ বলা হয়। ননডিসজাংশনে ২১ নাম্বার ক্রোমোজোমের ২টি কপির পরিবর্তে ৩টি কপি তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত ক্রোমোজোম অন্য কোষে রেপ্লিকেশন শুরু করে দেয়। প্রায় ৯৫% রোগীর এই রোগ হয়ে থাকে । ২) মোজাইক ডাউন সিন্ড্রোম এটি একটি বিরল ধরনের রোগ, যেখানে একাধিক কোষে অতিরিক্ত ২১তম ক্রোমোজোমের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এ কারণে গর্ভসঞ্চারের সময় সুস্থ কোষের পাশাপাশি একাধিক বিকৃত কোষ জন্ম নেয়। প্রায় ১% রোগীর ক্ষেত্রে এই রোগ দেখা দেয় । ৩) ট্রান্সলোকেশন ডাউন সিন্ড্রোম এক্ষেত্রে শরীরের ২১তম ক্রোমোজোমটি ভেঙে গিয়ে অন্য আরেকটি ক্রোমোজোম (সাধারণত ১৪ নাম্বার) এর সাথে যুক্ত হয়। প্রায় ৪% রোগীর এই রোগ হয়ে থাকে। ডাউন শিশুদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যঃ ডাউন শিশুদের কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক বৈশিষ্ট লক্ষ্য করা যায়। যেমন- মাংসপেশির শিথিলতা (Reduced muscle tone) বামন বা কম উচ্চতা (Short stature) চোখের কোনা উপরের দিকে উঠানো (Upward slanting Eyes) চ্যাপ্টা নাক (Flattened Nose) ছোট কান (Short Ear) হাতের তালুতে একটি মাত্র রেখা (Single Palmer Crease) জিহ্বা বের হয়ে থাকা ইত্যাদি (Protruding Tongue) এই রোগের কিছু লক্ষণ মাথার পিছনের দিকটা সমতল থাকা চোখের দৃষ্টি হয় ভিন্ন ছোট শরীর হয়ে থাকে ওজন থাকে কম হাত বড় হয় কিন্তু আঙুল হয় ছোট মেধা বা বুদ্ধাঙ্ক অনেকটাই কম হয় শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় ধীরে প্রতিরোধের উপায় উন্নত বিশ্বে প্রত্যেকটি গর্ভবতী মাকে ডাউন শিশু এবং অন্যান্য সম্ভাব্য জন্মগত ত্রুটি ও তা নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া চিকিৎসকের জন্য বাধ্যতামূলক। যেহেতু মা-এর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে, তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধিক বয়সে, বিশেষ করে পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব বয়সে মা হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। তবে বাচ্চার ডাউন সিনড্রোম রয়েছে কিনা এই বিষয়টি তার জন্মের আগেই ধরা যেতে পারে। ভ্রূণ অবস্থায় কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে এই সমস্যা ধরা যেতে পারে। একবার ভ্রূণ অবস্থায় এই রোগ ধরে ফেলতে পারলে, সমস্যা কাটানো যেতে পারে। কিন্তু একবার বাচ্চা জন্ম হয়ে যাওয়ার পর আর কিছু করার থাকে না। নেই তেমন চিকিৎসাও। তবে এই কথা শুনে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছুই নেই। বরং শিশুটির দিকে নজর রাখা খুব দরকার। তকে ভালো রাখুন পর্যাপ্ত ভালোবাসা দিন। এভাবেই সে ভালো থাকবে। আর এখন অনেক স্কুল বিশেষভাবে সক্ষম বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য নিজেদের তৈরি করছে। এছাড়া মনে রাখতে হবে যে, এই শিশুরা হল স্পেশাল বা বিশেষ। তাই ‘স্পেশাল কেয়ার’ বা যত্নের দরকার। তবেই সেই শিশুটি ভালো থাকতে পারে। দরকার জন সচেতনতা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)