ছোট বেলা থেকেই কিছুটা অন্য জগতের মানুষ ছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের পরিবারের সবাই একসময় ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো কোনদিন কথাই বলতে পারবেন না। এতো বড় মাপের বিজ্ঞানী হয়েও উনি মনে রাখতে পারতেন না উনার টেলিফোন নাম্বার। জানতেন না টাকা পয়সার হিসেব নিকেশ করতে। এমন অজস্র ঘটনা আছে উনার জীবনে। দারুন রোমান্টিক আর সুদর্শন পুরুষ ছিলেন তিনি। শুধুমাত্র বিজ্ঞান নয়, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাসেও সুপণ্ডিত ছিলেন তিনি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এই মহাবিশ্ব থেকে শুরু করে রাজনীতি, দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য নিয়ে দীর্ঘ আড্ডায় মেতেছিলেন জগৎ শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানী। শুধু বিজ্ঞান চর্চাই নয়, সঙ্গীত ছিল উনার খুব প্রিয়। খুব ভালো বেহালা বাজাতেন আলবার্ট আইনস্টাইন। শৈশব বাড়িতে গান-বাজনার চর্চা ছিল নিয়মিত। আলবার্ট আইনস্টাইনের মা খুব ভালো পিয়ানো বাজাতেন এবং সেই সময়ের একজন বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন। প্রায় সন্ধায় বাড়িতে বসত সঙ্গীতের আসর। ছোট্ট আলবার্ট আইনস্টাইন বাজাতেন বেহালা। খুব চুপচাপ আর শান্ত স্বভাবের ছিলেন তিনি। তখনও কথা বলেন না। উনার পিতা-মাতা যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ছেলে শেষ পর্যন্ত কথা বলবে তো! তখন উনার বয়েস চার। একদিন ডিনার টেবিলে আইনস্টাইন বলে উঠলেন, ‘স্যুপটা খুব গরম…’। ছেলে কথা বলতে পারছে দেখে মা-বাবা দারুন খুশী। সঙ্গে সঙ্গে উনার মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতদিন কথা বলোনি কেন?’ আইনস্টাইন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় বাক্যটি বললেন, ‘এতদিন তো সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল’। স্কুলে যেতে চাইতেন না। স্কুলের এই শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় কোনদিনই মন বসেনি ছোট্ট আইনস্টাইনের। তাছাড়া ইহুদি হওয়ার কারনে ছোটবেলা থেকেই অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে ছোট্ট ছেলেটিকে। তাই সব সময়েই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকতেন ছোট্ট আলবার্ট। এই ছোট্ট শিশুটিই ভবিষ্যতের দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানী এবং সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ। আইনস্টাইন কথা বলতে শুরু করেন চার বছর বয়সে। আর তিনি পড়তে শেখেন সাত বছর বয়সে। বিশ্বের অন্যতম বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন জন্মেছিলেন ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির উলম, উরটেমবারগে। সারা পৃথিবী এবছর আইনস্টাইনের ১৪৩ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। আইনস্টাইনের বাবা-মা ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত ইহুদি। বাবা হেরমান আইনস্টাইন মূলত পাখির পালকের তৈরি বেড বিক্রি করতেন। ছোটবেলায় একটি কম্পাস উপহার পেয়েছিলেন আইনস্টাইন। এই কম্পাস নিয়েই ছোটবেলাটা কাটত আইনস্টাইনের। আত্মভোলা আলবার্ট আইনস্টাইন এই জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী কখনও কলার তোলা পাট করা জামাকাপড় পড়তেন না। ইস্ত্রি ছাড়াই পোশাক পড়তেন। প্যান্টটাও একটু খাটো পড়তেন। প্রায় সময়েই মোজা পড়তেন দুই রঙের বা উল্টো। স্বপ্ন দেখতেন বিশ্ব নাগরিক হওয়ার। তিনি কেন এমন উদ্ভট সব কান্ড-কারখানা করে বেড়াতেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, সময় নষ্ট করার মতো সময় উনার নেই। তাই ইস্ত্রি ছাড়াই জামা পড়ে বেড়িয়ে যেতেন। প্রথম চাকরী পেয়েছেন। একটি কলেজে দুই মাসের জন্য সামান্য বেতনে পড়াবেন তিনি। নতুন শিক্ষক ক্লাশে ঢুকতেই ছাত্র-ছাত্রীরা সমস্বরে চিৎকার, কাগজের গোল্লা ছুড়তে থাকেন। একসময় আলবার্ট আইনস্টাইন ব্ল্যাক বোর্ড থেকে মুখ ঘুরিয়ে ছাত্রাছাত্রীদের বললেন, আমি মাত্র দুই মাসের জন্য পড়াতে এসেছি তোমাদের কিছু টাকার বিনিময়ে। আমি কিন্তু আমার নির্ধারিত সময়ে তোমাদের পড়াবোই। তোমাদের মধ্যে যাদের আমার ক্লাশ পছন্দ নয় তারা বেড়িয়ে যেতেই পারো। আমি কিছু মনে করব না। কিন্তু যারা ক্লাশ করতে চায় তাদের ক্লাশ করতে দাও। যদি পরে তোমাদের সহপাঠীরা বলে যে আমার ক্লাশ ভালো লাগে তখন আবার এসে ক্লাশে জয়েন করতেই পারো। কিন্তু এখন এভাবে হল্লা করতে পারোনা তোমরা। এই কথা শুনে ছাত্রছাত্রীরা বাধ্যের মতো ক্লাশ করলো। আর দারুন খুশী হোল। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ক্লাশের পরে চা-কফি খাওয়া, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আড্ডা চলতো প্রফেসর আর ছাত্র-ছাত্রিদের মধ্যে। প্রায় সময়েই আলবার্ট আইনস্টাইন সন্ধ্যার পরে কোন না কোন ছাত্র বা ছাত্রীর বাড়িতে চলে যেতেন। আড্ডা দিতেন এবং রাতের ডিনার শেষেই বাড়ি ফিরতেন। ছাত্রছাত্রীরা যখন ক্লাশে কোন প্রশ্ন করতেন তখন আলবার্ট আইনস্টাইন সেই ছাত্র বা ছাত্রীর প্রশ্ন শুনতেন মন দিয়ে। তবে পকেটে রাখতেন সব সময় একটা শেকলে বাধা ঘড়ি। একবার জনৈক সাংবাদিক আলবার্ট আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার বিজ্ঞান গবেষণার যন্ত্রপাতি আর গবেষণাগার কোথায়?’ -আইনস্টাইন সাংবাদিকের সেই উত্তর শুনে নিজের মাথাটা দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটাই আমার গবেষণাগার’। আর নিজের পেনটি দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটাই আমার যন্ত্র’। মহাবিশ্বের জটিল সব বিষয় নিমেশে শুধু মাত্র অঙ্ক কশেই সমাধান করে দিতেন এই বিজ্ঞানী। মাত্র কয়েকদিন আগেই বিজ্ঞানীরা তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে নির্ভুল হিসেবে মেনে নিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকর্ষ তরঙ্গের ওপর ভর করেই চলছে মহাবিশ্ব। পৃথিবীর ঘূর্ণন, গ্রহ-নক্ষত্রের গতি সব কিছুই ঘটছে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কারণে। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতা তত্ত্বেই এই তরঙ্গ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করার মাধ্যমে আইনস্টাইনের তত্ত্ব নির্ভুল প্রমাণিত হয়। যদিও আইনস্টাইন নিশ্চিত ছিলেন উনার তত্ত্ব নিয়ে। কিন্তু সেই সময়কার সমকালীন বিজ্ঞানীরা একজোট হয়ে সমালোচনা করেছিলেন আইনস্টাইনের। তিনি এই বিষয়টি নিয়ে মজার চলে বলেছিলেন, একশ জন বিজ্ঞানী কেন এতো পরিশ্রম করছে! একজনই তো যথেষ্ট ছিল’। প্রেম এবং বিয়ে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মিলেভা মারিচ কে। ৬ই জানুয়ারি ১৯০৩ বের্ন-এর রেজিস্ট্রি অফিসে হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এক অতি নিভৃত আইনি বিয়ে করেন এই বিজ্ঞানী। বর-কনে কারও বাড়িরই কেউ সেখানে নেই। ম্যারেজ রেজিস্ট্রিতে সই শেষে বন্ধুদের খাওয়াতে নিয়ে গেলেন এক রেস্তোরাঁয়। তার পর অধিক রাতে বৌ নিয়ে বাড়ি ফিরে প্রফেসর আবিষ্কার করলেন যে, বাড়ির চাবি নেই পকেটে। নতুন বউ নিয়ে তালা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকলেন আইনস্টাইন। একসময়ে মিলেভা মারিচের সঙ্গে উনার বিবাহ বিচ্ছেদও হয়ে যায়। দেখতে খুব সুন্দরী না হলেও বিজ্ঞানের প্রতি অদম্য উৎসাহ ছিল মিলেভার। আর ভীষণ মিষ্টি কণ্ঠস্বর ছিল মিলেভার। যা আইনস্টাইনের বিশেষ পছন্দের ছিল। কিন্তু গবেষণায় ব্যস্ত আইনস্টাইন ছিলেন সংসারের প্রতি সত্যিই উদাসীন। মিলেভার অভিযোগ ছিল, আইনস্টাইন সংসার সম্পর্কে একদম উদাসীন। অথচ আইনস্টাইন মিলেভাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। নোবেল পুরস্কারের অর্ধেকটা অর্থ এই মিলেভাকেই দিয়েছিলেন আইনস্টাইন। নোবেল পুরষ্কার ১৯০৫ সালে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ হতে সবারই ধারণায় ছিল যে আইনস্টাইন আজ হোক, কাল হোক, পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেনই। কিন্তু সমকালীন বিজ্ঞানীরা কিছুতেই মান্যতা দেবেন না এই তত্ত্বকে। অনেক আলোচনা সমালোচনা। উন্মাদনারও শেষ নেই। নোবেল কমিটি ১৯২১ সালে শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইনকে নোবেল প্রাইজ দিলেন। এই নোবেল নিয়েও আছে এক মজাদার গল্প। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কখনও না কখনও নোবেল আসছে জেনেই আইনস্টাইন বিবাহ-বিচ্ছেদ চুক্তিতে জানিয়ে রেখেছিলেন যে পুরস্কার পেলে তার অর্ধেক অর্থমূল্য যাবে প্রাক্তন স্ত্রী মিলেভা মারিচের হাতে। সেই মতো ৩২,২৫০ মার্কিন ডলারের পুরস্কার অর্থ জুরিখে ও আমেরিকার দুটি অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে মিলেভা ও ওদের পুত্রদের নামে। বাকী অর্থ আইনস্টাইন সমাজসেবায় দান করেন। মিলেভা সেই পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনটে বা়ড়ি কিনেছিলেন জুরিখে। বিবাহ বিচ্ছেদের পর থেকে খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। কিন্তু কোন অভিযোগ করেননি। অবশ্য পরে তিনিও একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুর পরেও অমর আইনস্টাইন সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, মৃত্যুর পরেও আলবার্ট আইনস্টাইন অমর। বিজ্ঞানের ইতিহাসকে ওলট-পালট করে দেওয়া আলবার্ট আইনস্টাইন দেহত্যাগ করেন ১৯৫৫ সালের ১৮ই এপ্রিল প্রিন্সটন হাসপাতালে। অনেকে আইনস্টাইনের মৃত্যুকে স্বেচ্ছামৃত্যু বলে মনে করেন। আসলে ডাক্তাররা সার্জারি করিয়ে ভালো করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আইনস্টাইন রাজি হননি তাতে। যদিও তখনও সার্জারি বিদ্যেটা আজকের মতো আধুনিক রূপ পায়নি। তাই অপারেশন করলেও আইনস্টাইন বাঁচতেন কিনা জোর দিয়ে বলা যায় না। তবে শেষ চেষ্টা হয়তো করা যেত। ১৯৫৫ সালের ১৮ই এপ্রিল, আইনস্টাইনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছিল হাসপাতাল প্রাঙ্গন। ভক্ত, সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান ভিড় ঠেলে, তাদের অগোচরে আইনস্টাইনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মর্গে। পোস্টমর্টেমের ভার পড়েছিল ড. থমাস হার্ভের ওপর। পেশায় চিকিৎসাবিদ। মর্গের ময়না তদন্তের দায়িত্বে তিনিই ছিলেন। তিনি আইনস্টাইনের শবদেহ ব্যবচ্ছেদের পর সরিয়ে রেখেছিলেন মহাবিজ্ঞানীর মগজ। কাজটা তিনি করেছিলেন গোপনে। জানাননি আইনস্টাইনের পরিবারকেও। তাছাড়া আইনস্টাইন নিজেই চাননি তাঁর দেহের এতটুকু অংশ পৃথিবীতে টিকে থাকুক। এজন্য পুড়িয়ে ছাই করে ফেলতে বলেছিলেন তাঁর মরদেহ। সেই ছাই কোথায় ফেলা হচ্ছে সেটাও যেন কাকপক্ষিতে না জানে এমনটাই নির্দেশ ছিল মহাবিজ্ঞানীর। কারণ স্পষ্ট। ব্যক্তিপুজো পছন্দ ছিল না আইনস্টাইনের। কেউ যাতে তাঁর সমাধিক্ষেত্র পবিত্র দর্শনীয় স্থান বানিয়ে ফেলতে না পারে, মৃত্যু কিংবা জন্মদিনে ফুলের স্তূপে যাতে চাপা না পড়ে তার কবর, এজন্যই দিয়েছিলেন পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ। সেই নির্দেশের তোয়াক্কা না করে তাঁর মস্তিষ্ক সরিয়ে রাখা হলো। এখনও সেই মস্তিস্ক নিয়েই চলছে গবেষণা। নিত্যনতুন তথ্য বেড়িয়ে আসছে এখনও আইনস্টাইনকে নিয়ে। আইজাক নিউটন ছিলেন উনার প্রিয় বিজ্ঞানী। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভালো বন্ধু ছিলেন এই বিজ্ঞানী। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা।