বিজ্ঞানীরা সাধারণত একটু আত্মভোলা হয়ে থাকেন। অজস্র মজার ঘটনা আছে আইনস্টাইনকে নিয়ে। আত্মভোলা এই বিজ্ঞানীকে নিয়ে এমনই কিছু মজার ঘটনা জেনে নেবো এই প্রতিবেদনে। অতি সাধারণ আর আত্মভোলা জীবনযাপনের জন্যে অনেক কষ্টও কিন্তু পেয়েছেন জীবনে। সাংসারিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে এতোটাই উদাসীন ছিলেন যে উনার স্ত্রী মেলিভাই উনাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন দুই সন্তানকে নিয়ে। টাকা পয়সার হিসেবটুকুও জানতেন না তিনি। চশমা ছাড়া আইনস্টাইন আইনস্টাইন একবার রেলগাড়ির ডাইনিংয়ে রাতের খাবার খেতে এসে দেখলেন, চশমা ফেলে এসেছেন। খালি চোখে মেন্যুও পড়া যাচ্ছে না। তিনি ওয়েট্রেসকে ডেকে বললেন, দয়া করে মেন্যুটা পড়ে দাও। ওয়েট্রেস তাঁর দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘দুঃখিত স্যার, আমার পড়াশোনার দৌড়ও আপনার মতোই।’ ভাবুন অবস্থা। গন্তব্যটাও ভুলে যেতেন বিজ্ঞানীরা বরাবরই কিছুটা ভুলোমনা হয়ে থাকেন, তবে এদিক থেকে নোবেলজয়ী বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বোধ হয় একটু বেশিই এগিয়ে ছিলেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর টিকেট বিড়ম্বনায় বারবারই পড়তেন। দিন কয়েকের জন্য প্রথমবারের মতো এক বড় শহরে বেড়াতে গিয়েছেন আইনস্টাইন। এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে বাসে চেপে হোটেলে ফিরছেন। বাসের কন্ডাক্টর টিকেট চাইলে তিনি খুবই বিব্রতবোধ করলেন। এ পকেট সে পকেট হাতড়ে কোথাও টিকেট পেলেন না। বাস কন্ডাক্টর তাঁকে বিব্রত হতে দেখে বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনাকে আর ব্যস্ত হতে হবে না। টিকেটটা কোথাও পড়ে গেছে হয়তো।’ এ কথা শুনে আইনস্টাইন বিচলিত হয়ে বললেন, ‘আরে না, বলছ কি তুমি! টিকেট না পেলে আমি হোটেলে ফিরব কী করে? টিকিটের উল্টো পাশে হোটেলের নাম-ঠিকানা লেখা ছিল যে! টিকিটটা না পেলে আমি হোটেলেই ফিরতে পারবো না।’ আরেকটি মজার ঘটনা আছে এই টিকিট নিয়ে। একবার তিনি ট্রেনে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। টিকিট চেকার এসে টিকেট দেখতে চাইলেন উনার কাছে। কিন্তু আইনস্টাইন কিছুতেই টিকেট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুধু বিড়বিড় করছেন, ‘কোথায় যে রাখলাম টিকিটটা!’ চেকার বললেন, ‘স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই টিকিট কেটেই উঠেছেন। আপনাকে টিকেট দেখাতে হবে না।’ আইনস্টাইন চিন্তিত মুখে বললেন, ‘না না! ওটা তো খুঁজে পেতেই হবে! না পেলে জানব কী করে, আমি কোথায় যাচ্ছিলাম!’ ভাবুন এভাবেই নিমগ্ন থাকতেন নিজের জগতে। মনের ভাব একটি সভায় আইনস্টাইনকে একনজর দেখানোর জন্য এক বাবা তাঁর ছোট্ট শিশুকে উঁচু করে ধরলেন আইনস্টাইনের সামনে। শিশুটি তখন তারস্বরে কাঁদছে। বৃদ্ধ আইনস্টাইন শিশুটির গাল টিপে দিয়ে বললেন, ‘এত বছর বয়সের মধ্যে একমাত্র তুমিই অকপটে আমার সম্পর্কে মনের ভাব প্রকাশ করলে। ধন্যবাদ।’ বুড়ো ছাত্র আইনস্টাইন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে খুব মজা করতেন বিশ্ব বিখ্যাত এই বিজ্ঞানী। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল উনার। ক্লাশ শেষে কফি নিয়ে আড্ডায় বসে পড়তেন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। প্রতি সন্ধ্যায় চলে যেতেন কোন না কোন ছাত্র-ছাত্রীর বাসায়। চলতো আড্ডা আর সঙ্গীত। ডিনার শেষেই বাড়ি ফিরতেন তিনি। পাহাড় খুব পছন্দের ছিল উনার। এমনই এক পার্টিতে আইনস্টাইনকে চিনতে না পেরে এক তরুণী জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কী করেন?’ আইনস্টাইন বললেন, ‘আমি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র।’ তরুণী অবাক, ‘কী! এই বয়সে আপনি এখনো ছাত্র? আমি তো গত বছর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেলেছি।’ একবার আইনস্টাইনের এক ছাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসে অনুযোগের সুরে বলল, ‘স্যার, এবারের পরীক্ষার প্রশ্নগুলো প্রায় সবই গতবার পরীক্ষায় এসেছিল। হুবহু একই প্রশ্ন। তা হতে পারে-আইনস্টাইন বললেন, কিন্তু খাতা দেখতে গিয়ে লক্ষ করলাম উত্তরগুলো সব আগের বছরের চেয়ে আলাদা। আপেক্ষিক তত্ত্বের বিরোধিতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আইনস্টাইন যখন বিজ্ঞান ছেড়ে প্রায় নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন, তখন হিটলারপন্থী ১০০ জন অধ্যাপক একটি বই প্রকাশ করেন। যার বিষয়বস্তু ছিল আপেক্ষিক তত্ত্বের বিরোধিতা। আইনস্টাইন ব্যাপারটি জেনে মন্তব্য করেন, ‘আমার তত্ত্ব ভুল প্রমাণ করার জন্য একজন অধ্যাপকই তো যথেষ্ট ছিল। একশ জন কেন?’ বিজ্ঞান আর ফ্যাশন আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ তত্ত্ব আবিষ্কারের পর সেই সময়ে অল্প কয়েকজন বিজ্ঞানী শুধু বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই আবিষ্কারের ফলেই তাঁর জনপ্রিয়তা সর্বস্তরে পৌঁছে যায়। এক চুরুট কোম্পানি তো তাদের চুরুটের নামই ‘রিলেটিভিটি চুরুট’ রেখে দেয়। সে সময় এক সাংবাদিক আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা বলুন তো, থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে চারদিকে এত আলোচনা হচ্ছে কেন?’ আইনস্টাইন মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, ‘মানুষ ফ্যাশন পছন্দ করে। আর এ বছরের ফ্যাশন হলো থিওরি অব রিলেটিভিটি। তাই এই থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে এত আলোচনা।’ ভুলে যেতেন টেলিফোন নম্বর আইনস্টাইনের এক সহকর্মী একদিন তাঁর টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। আইনস্টাইন তখন টেলিফোন গাইডে নিজের নম্বর খুঁজতে শুরু করেন। এদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে দেখে সহকর্মী বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি তোমার নিজের নম্বরটাও মনে রাখতে পারো না?’ এই কথায় আইনস্টাইন উল্টো যুক্তি দেখিয়ে বললেন, ‘যে জিনিসটা টেলিফোন গাইডে লেখা আছে, সেটা আমি খামোখা মুখস্থ করতে যাব কেন?’ ভাবুন যুক্তি। এই মানুষটিই শুধু অঙ্ক কষেই তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সারা পৃথিবীকে। প্রেমিক আইনস্টাইন খুব রোমান্টিক মানুষ ছিলেন আইনস্টাইন। বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মেধার তুলনায় তাঁর চেহারা ছিল নিতান্তই সাদামাটা। তারপরও একবার এক সুন্দরী অভিনেত্রী উনাকে প্রস্তাব দিলেন, ‘চলুন আমরা বিয়ে করে ফেলি। তাহলে আমাদের সন্তানের চেহারা হবে আমার মতো সুন্দর আর মেধা হবে আপনার মতো প্রখর।’ আইনস্টাইনের প্রথম প্রেমে পড়া ও প্রথম বিজ্ঞান প্রবন্ধ লেখা একই বয়সে। মাত্র ১৬ বছরেই তিনি প্রথম বিজ্ঞান প্রবন্ধ লেখেন এবং একই সঙ্গে প্রেমেও পড়েন। প্রবন্ধটি ছিল ‘চৌম্বক ক্ষেত্রে ইথারের অবস্থান নিয়ে অনুসন্ধান’। আর প্রেমিকা ছিল মারি ভিন্টেলার। আলবার্টের চেয়ে দু’বছরের বড়, সদ্য কলেজে শিক্ষক হওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায়। আলবার্ট তখন ভিন্টেলার পরিবারের সঙ্গেই থাকে, জুরিখ থেকে পঁচিশ মাইল পশ্চিমে, আরাউ গ্রামে। আরাউ গ্রামে কেন? কারণ অত অল্প বয়েসে জুরিখ পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়া যাবে কিনা সন্দেহ ছিল আলবার্টের। আলবার্ট বেছে নিয়েছিল আরাউয়ের গ্রামের জীবন। সেখানকার ইস্কুলের খোলামেলা পড়াশুনোর পরিবেশ। একই সঙ্গে প্রেমে পড়েছিল গ্রামটির ও ভিন্টেলার পরিবারের মেয়েটির। যদিও প্রথম প্রেম শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। সুপুরুষ আইনস্টাইন প্রেমিকা মারি ভিন্টেলার বোন আনা সে-সময়ের আলবার্টকে বর্ণনা করেছেন এ ভাবে: ‘ওর দারুণ রসবোধ ছিল। আর সময়-সময় আলবার্ট প্রাণভরে হাসত।’ আরেক মহিলার বর্ণনায়, ‘মেয়েদের মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো পুরুষালি চেহারা ছিল ওর। ঢেউ খেলানো কালো চুল, অভিব্যক্তিপূর্ণ চোখ ও চাহনি, চওড়া কপাল আর খোশমেজাজি স্বভাব। ওর মুখের নীচের অংশ হতেই পারত কোনও ইন্দ্রিয়াসক্ত পুরুষের, যার জীবনের প্রতি টানের অভাব নেই।’ ছেলের প্রথম প্রেমের কথা জানতেন আলবার্টের মাও। আলবার্ট ও মারির প্রেম নিয়ে ওদের দুই পরিবারেই ছিল প্রবল চাঞ্চল্য। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, সমসাময়িক পত্রপত্রিকা।