ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’ ড. এপিজে আব্দুল কালাম আজ এই দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। বিশেষ করে আজকের ইয়ুথদের আইকন তিনি। ঝাঁকরা চুলের এই সদা হাস্য, সরল মনের মানুষটির জীবন কেটেছে অনেক লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। আজ আমরা জানবো ভারতের মিসাইল ম্যান ড. কালাম সম্পর্কে। শৈশব ড. আবুল পাখির জয়নুলাবেদিন আব্দুল কালাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৩১ সালের ১৫ই অক্টোবর, তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমে। পিতা জয়নুলাবেদিন ছিলেন একজন মৌলবি এবং নৌকা তৈরির কারিগর। খুব গরীব ছিলেন। তিনি একটি নৌকো করে তীর্থযাত্রীদের রামেশ্বরম থেকে ধনুস্কোডীতে নিয়ে যাওয়ার কাজ করতেন। মাতা ছিলেন, আশিয়াম্মা। তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন। ড. কালাম ছিলেন পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। কালামের মা আশিয়াম্মা অনেক সময় ছেলেমেয়েদের খাওয়ার ব্যাবস্থা কোনমতে করে নিজে না খেয়েই অর্ধাহারে রাত কাটাতেন। চরম অর্থকষ্টের মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলেন কালাম। কৈশোর আর ছাত্রজীবনের লড়াই ড. কালাম জীবনে অনুপ্রেরণা হয়ে ছিলেন আহমেদ জালালুদ্দিন (ড. কালামের বড় বোনের স্বামী), সামসুদ্দিন (ড. কালামের কাকাতো ভাই)। এই সামসুদ্দিনের কাছ থেকে পত্রিকা নিয়েই তিনি পত্রিকা বিক্রি করতেন। ট্রেন থেকে পত্রিকার বান্ডিল ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হতো স্টেশানে স্টেশানে। ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে সেই পত্রিকা কুড়িয়ে সেগুলি পৌঁছে দিতেন পাঠকের কাছে। এবং শিবা সুব্রাহ্মনিয়াম আয়ার (স্কুলের শিক্ষক) যিনি ড. কালামকে উড়ন্ত পাখি কিভাবে ডানা মেলে আকাশে ভেসে বেড়ায় তা প্রত্যক্ষ করার জন্য সমুদ্রতীরে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই পারিবারিক অনটনের মধ্যেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি স্কুল ছাত্র। আশেপাশে প্রচণ্ড খাদ্যের আকাল। তিনি তেঁতুলের বিচি সংগ্রহ করে চলে যেতেন গ্রামে গ্রামে। সেখানে গিয়ে খুব কম দামে সেই বিচি বিক্রি করে সংসারে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই একটু পড়াশোনা সেরে চলে যেতেন বাজারে। সেখানে মাছের ব্যাবসা সামলাতেন ছোট কালাম। এরপর বাজার থেকে ফিরেই স্কুলে। ছোট থেকেই পড়াশোনায় তুখোড় ছিলেন কালাম। বাবার একটা বড় নৌকো ছিল। একদিন সমুদ্রের ঝড়ে সেই নৌকা ভেসে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় পারিবারে আর্থিক টানাপোড়েন। ড. কালাম সেন্ট জোসেফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করার পর মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট (MIT) ভর্তি হন। কিন্তু ভর্তি হতে এক হাজার টাকার দরকার ছিল। কিন্তু সেই সময় ড. কালামের অর্থনৈতিক অবস্থা এতোটাই খারাপ ছিল যে, কালামের পিতা সেই টাকাটাও জোগাড় করতে পারেননি। তখন ড. কালামের বড় বোন অসীম জোহরা নিজের গলার স্বর্ণের হার এবং হাতের বালা বন্ধক দিয়ে ভাইকে এম আই টি-তে ভর্তির জন্যে এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ড. কালামের কর্মজীবন এম আই টি থেকেই ড. কালাম যোগ দেন ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা কেন্দ্রে। উনার নেতৃত্বেই ভারতে প্রথম তৈরি হয় হোভার ক্রাফট। তিনি নাসা-তে প্রায় ছয় মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ভারতের মহাকাশ গবেষণা, উপগ্রহ প্রেরণ, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মূল প্রকৌশলী ছিলেন ড. কালাম। ড. কালামকে ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’ বলা হয়। ভারতবর্ষে পরমাণু গবেষণা, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং প্রযুক্তি বিজ্ঞানে উনার অসামান্য অবদানের জন্যে তিনি ১৯৯০ সালে ‘পদ্মভূষণ’, ১৯৯৭ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং ‘ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় একতা পুরস্কারে’ ভূষিত হন। পেয়েছেন ‘ভারতরত্ন’ সহ আরও অজস্র সম্মান। ২০০২ সালে ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি হিসাবে ড. কালাম দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনিই ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি, যিনি রাষ্ট্রপতি ভাবনকে জনসাধারণের নিজের মত প্রকাশের স্থান ও রাষ্ট্রপতিকে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরিচিত করতে চেয়েছিলেন। ছাত্রছাত্রীরাই ছিল উনার প্রাণ ড. কালামের হৃদয় ছিল শিশুর মতো সরল এবং কোমল। উনার লক্ষ্য ছিল দশ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেই চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি ভারতীয় গণমাধ্যম গুলিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাঠকের কাছে উপস্থিত হতে বলেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি উনার জীবনের একটি গল্প শেয়ার করেছিলেন। ঘটনাটি হলো, ড. কালাম একবার ইজরায়েলের তেল আভিভে বসে একটি সংবাদপত্র পড়ছিলেন। তিনি যে তারিখের পত্রিকাটি পড়ছিলেন ঠিক তার আগের দিন হামাস উগ্রপন্থীদের আক্রমণ এবং বোমা হামলায় অনেক মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু পত্রিকাটি প্রথম পৃষ্ঠায়, বিস্ফোরণের ভয়াবহ খবর না ছেপে ছেপেছিল এক কৃষক কিভাবে বালিমাটির জমিতে পরিশ্রম করে ফলের চাষ করেছিল তার সচিত্র প্রতিবেদন। ড. কালাম বলেছিলেন এই ধরনের খবর, জাতীকে নতুন দিশা দেখায়, অনুপ্রেরণা যোগায়। অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন ড. কালাম। চুলের শখ ছাড়া আর কোন শখ কোনদিনই উনার ছিল না। রাষ্ট্রপতি ভবনে শপথ নিতে এসেছিলেন একটি স্যুটকেস সম্বল করে। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে ইস্তফা দেয়ার পরেও এক কাপ চা খেয়ে সেই স্যুটকেস সম্বল করেই সেই রাতে আশ্রয় নেন এক বন্ধুর বাড়িতে। সহজ সরল ড. কালাম প্রতিনিয়ত নিজের আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর উনার পরিবারের সবাই ঘুরতে এসেছিলেন দিল্লীতে। ছিলেন রাষ্ট্রপতি ভবনেই। যতদিন উনার আত্মীয় পরিজনেরা রাষ্ট্রপতি ভবনে ছিলেন ততদিন তাঁদের সমস্ত খরচাপাতি তিনি নিজে পাই টু পাই বহন করেছেন। নিজের আত্মীয় পরিজন সহ অনেক দরিদ্র ছাত্রছাত্রীকে তিনি বিভিন্নভাবে সাহায্য করতেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের ইয়ুথ আইকন। খুব ভালো বীণা বাজাতেন তিনি। উনার সম্পদ বলতে সেই একটিই বাদ্যযন্ত্র বীণা আর প্রচুর বই এবং জার্নাল। এমনকি উনার ঘরে কোন টেলিভিশানও ছিলনা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন ড. কালাম। প্রয়াণ ভারতের এই মিসাইল ম্যান ২৭ জুলাই ২০১৫ সালে শিলঙয়ের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) -এর একটি অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের সামনে ভাষণ দেয়ার সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন। ৩১ জুলাই উনার মাতৃভূমি রামেশ্বরমের পেইকারোম্ব মাঠে নশ্বর দেহকে চিরশায়িত রাখা হয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে উনার গুণগ্রাহী প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ সেই শেষযাত্রায় শবযাত্রী হয়েছিলেন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইংস অব ফায়ার, লেখকঃ অরুণ তিওয়ারি