লুই পাস্তরের জীবনের অজানা কাহিনী ফ্রান্সের জুরা প্রদেশের ডোল শহরে ১৮২২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ শে ডিসেম্বর লুই পাস্তুরের জন্ম। বেড়ে ওঠা আরাবোয়া শহরে। গরীব পরিবারের সন্তান। বাবা একটি ট্যানারিতে কাজ করতেন। কিন্তু বাবা কোনদিনই চাইতেন না এই চামড়ার কাজে ছেলে লুই আসুক। তাই পড়াশোনার জন্য লুই-কে পাঠিয়ে দিলেন শহরে। কিন্তু শহরের সেই কাঠ-পাথরের জীবন উনার পছন্দ নয়। কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারতেন না শহুরে জীবনের সঙ্গে গ্রামের ছেলে লুই। প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। আর অসুস্থ হলেই তিনি বলতেন, ঐ চামড়ার গন্ধ পেলেই তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। যাই হোক ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন মেরি কে। এক দেখাতেই প্রেম যাকে বলে। বিয়ের স্ত্রী মেরিই হয়ে ওঠেন উনার সহায়ক। পাঁচ সন্তানের জনক লুই পাস্তুর দম্পতি। কিন্তু অকালেই টাইফয়েডে মারা যায় তাঁর তিন ছেলে। তবুও এই পারিবারিক শোক সামলে আমৃত্যু মানব কল্যাণে চালিয়ে গেছেন বিজ্ঞানের গবেষণা। ব্যাক্তিগত জীবন রসায়নে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করার পর স্টাপ বূর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক গ্রহণ করলেন লুই পাস্তর। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ছিলেন মসিয়ে লরেন্ট। লরেন্টের গৃহে প্রায়ই যেতেন লুই। লরেন্টের ছোট মেয়েকে মেরিকে দেখে তাঁর প্রেমে পড়ে যান লুই। মেরি’কে বিয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। মেরি এবং লরেন্ট এই প্রস্তাব সাগ্রহে মেনে নেন। কিন্তু বিয়ের দিন চার্চে, গাউন পড়ে বিয়ের জন্য প্রস্তত মেরি এবং অন্যান্য অভ্যাগতরা। কিন্তু পাত্র লুইয়ের দেখা নেই। শেষপর্যন্ত অধৈর্য হয়ে লুই-এর এক বন্ধু ছুটে যান বন্ধুর খোঁজে। গিয়ে দেখেন ল্যাব-এ লুই কিছু একটা নিরীক্ষণে ব্যাস্ত। ভুলেই গেছেন উনার নিজের বিয়ের কথা। এমনই আপনভোলা মানুষ ছিলেন লুই। মেরি আজীবন লুইয়ের পাশে সহকারীর মতো থেকেছেন। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন সন্তানই মারা যান। তাই সন্তান শোকে বিহ্বল ছিল লুই দম্পতি। কিন্তু সবকিছুর উপরে ছিল বিজ্ঞান সাধনা। অণুজীব বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গুটিবসন্তই ছিল একমাত্র সংক্রামক রোগ যা টিকার মাধ্যমে প্রতিহত করা যেত। আগেই বলেছি এই প্রতিরোধের মূলমূন্ত্র ছিল অনুরূপ কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম তীব্র বসন্তের জীবাণু। প্রাকৃতিক কারনেই গরুর শরীরে এই জীবাণুর সংক্রামণ। প্রকৃতিগতভাবেও এটা ছিল দুর্বল জীবাণু। তখনও পর্যন্ত জীবাণুকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল বা রোগাক্রান্ত না করার উপযোগী করে প্রস্তুত করার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। প্রথম যিনি কৃত্রিম উপায়ে একটি ব্যাকটেরিয়াকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি ফরাসী রসায়নবিদ ও অণুজীববিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। শুধু টিকার ক্ষেত্রেই না, গুটিপোকার হাত থেকে রেশম শিল্পকে রক্ষা করে ফ্রান্সের বস্ত্রশিল্পকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন তিনি। তরল দুধ জীবাণুমুক্তকরণের পদ্ধতি “পাস্তুরাইজেশনের”ও আবিষ্কারক তিনি। তাঁকে চিকিৎসা অণুজীববিদ্যার অগ্রদূত বলা হয়। কেননা তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে আণুবীক্ষনিক জীব গাঁজন ও রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। ছত্রাক কৃত্রিম ও অবাত স্থানেও বংশবিস্তার করতে পারে, তাঁর এই ধারণাটি ‘পাস্তুর প্রভাব’ নামে পরিচিত। তাছাড়া দুধে বাইরে থেকে অণুজীব ছেড়ে দিলে দুধ টক স্বাদযুক্ত হয় এবং কেন হয় সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। পাস্তুর ১৮৬২ সালে তাপ ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে সক্রিয় ব্যাকটেরিয়ার তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হন। ১৮৭৯ সালে হাঁস-মুরগির কলেরা রোগ নিয়ে গবেষণাকালে তিনি জেনার-এর অনুরূপ ফলাফল দেখতে পান। তিনি এই রোগের জীবাণু প্রথমত পৃথক এবং পরে দুর্বল করে পুনরায় মুরগীর দেহে প্রবেশ করান। মুরগীগুলো রোগমুক্ত হয়। একই প্রক্রিয়া তিনি অ্যানথ্রাক্স ও জলাতঙ্ক রোগের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী চিকিৎসক রবার্ট কচ ১৮৭৫ সালে প্রথম অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু আবিষ্কার করেন। এদিকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা ব্যবহার করে ১৮৮১ সালে পাস্তুর একটি ভেড়ার পালকে অ্যানথ্রাক্সমুক্ত করেন। পাস্তুর, আক্রান্ত পশুর লালা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে আসেন যে জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাস স্নায়ুকেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তিনি রোগাক্রান্ত পশুর মস্তিষ্কের মেডুলা অবলাঙ্গাটা সুস্থ পশুর দেহে প্রবেশ করিয়ে আক্রান্ত পশুর অনুরূপ উপসর্গ দেখতে পান। তাছাড়া আক্রান্ত পশুর শুষ্ক টিস্যুর ওপরে সময় ও তাপমাত্রার প্রভাব এবং সেখান থেকে দুর্বল বৈশিষ্টপূর্ণ ভাইরাস আলাদা করে সেগুলোকে টিকার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন। পাস্তুর জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কার করেন ১৮৮৫ সালে। তাঁর প্রথম রোগী ছিল নয় বছর বয়সী ‘জোসেফ মেইস্টার’ যাকে পাগলা কুকুর কামড়ে দিয়েছিল। ছেলেটি রোগমুক্ত হওয়ার পর পাস্তুরের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর দুই বছর পর সংক্রামক রোগ নিয়ে বিস্তর গবেষণার লক্ষ্যে তিনি প্যারিসে ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠানটি এখনও বেশ সুনামের সাথে সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে। ১৯৮৩ সালে এখানেই প্রথম সফলভাবে এইচ-আই-ভি ভাইরাস পৃথক করা হয়। এখন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান থেকে দশজন বিজ্ঞানী মেডিসিন ও ফিজিওলজিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তৃতীয় নেপোলিয়ান বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান লুই পাস্তর’। জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কারের পর ফরাসি সরকার তৈরি করেন পাস্তুর ইনস্টিটিউট। এই সংস্থার পরিচালক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ শে নভেম্বর এই মহান বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়। এখন অবশ্য জলাতঙ্কের চিকিৎসায় হিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল্ কালচার ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হয়। তবে পথপ্রদর্শক হিসেবে লুই পাস্তুর এবং যোশেফের জননী দুজনেই আজ চির স্মরণীয়। উপসংহার পৃথিবী হচ্ছে জীবাণুর আঁতুড়ঘর। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে এইসব জীবাণুর সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। সেজন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রস্তুতি। টিকা ছিল এই প্রস্তুতির প্রথম ধাপ। পরবর্তীতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, ছত্রাক ইত্যাদির জন্য আরও বিস্তৃত পরিসরে ঔষধ আবিষ্কৃত হয়েছে, টিকাও পাওয়া গেছে। টিকা যেভাবে আমাদের আজীবন বা দীর্ঘস্থায়ী একটা সমাধান দেয়, এইসকল ঔষধ থেকে আমরা তা পাই না, কেননা এদের মাধ্যমে আমাদের ক্ষণস্থায়ী আরোগ্যলাভ হয় ঠিক কিন্তু আমরা যখন আবার সক্রিয় একটা জীবাণুর সংস্পর্শে আসি তখন পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়ি। টিকার আবিষ্কার মানুষকে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি যুগিয়েছে, জীবনকে করেছে দীর্ঘস্থায়ী, শিশুদেরকে দিয়েছে রোগমুক্ত নিরাপদ ভবিষ্যৎ। গুটিবসন্তকে পৃথিবী থেকে নির্মুল করা সম্ভব হয়েছে। চেষ্টা চলছে পোলিওকে নির্মুল করার। আমরা পৃথিবীর সকল জীবাণুকে পুরোপুরি জয় করতে সক্ষম হয়েছি বলা যাবে না। এদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানও থেমে নেই। লুই পাস্তুরের পর থেকে আজ পর্যন্ত আরও বেশ কিছু টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। এইসব টিকা তৈরির ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। লেগেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। কিন্তু কিছু ‘ভয়ঙ্কর’ রোগের টিকা এখনও নেই। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সেই টিকাও আবিষ্কৃত হবে। সেই লক্ষ্যেই গত তিনশ-চারশ বছর ধরে নিরন্তর গবেষণা চলছে। তবে টিকা আবিস্কারের অগ্রণী কিন্তু ছিলেন এই ফরাসী অণুজীববিজ্ঞানী লুই পাস্তর। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ বিজ্ঞানী লুই পাস্তরের জীবনী, সমসাময়িক সাইন্স জার্নাল।