হিন্দু ধর্মানুসারে ছট পূজা হল মূলত সূর্য দেবের পূজা। ছট পূজা ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ডের কিছু অংশে সাড়ম্বরে উদযাপন করা হয়। তবে ছট পূজার আধিক্যতা বিহার রাজ্যের মানুষদের মধ্যেই সর্বাধিক। তাই ছট পূজাকে বিহারীদের উৎসব বলা হয়। ছট পূজা কি ? ছট পূজা হল সূর্য এবং তার স্ত্রী উষা দেবীর পূজা। তবে ছট পূজার মধ্যে দিয়ে মূলত সূর্য দেবের উপাসনা করা হয়। প্রতিবছর কার্তিক মাসের শুক্ল তিথিতে চতুর্দশীর দিন (কালীপুজোর ০৬ দিন পর) থেকে সপ্তমী পর্যন্ত মোট চার দিন ধরে ছট পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া চৈত্র মাসে একই নিয়মে আরো একবার ছট পূজা হয়। কার্তিক মাসের ছট পূজাকে কার্তিক ছট এবং চৈত্র মাসের ছট পূজাকে চৈতি ছট বলা হয়। ছট পূজার পৌরাণিক তাৎপর্য হিন্দু ধর্মে রামায়ণ এবং মহাভারতের কাহিনীতে ছট পূজার কাহিনীর বর্ণনা পাওয়া যায়। রামায়ণে শ্রী রামচন্দ্র লঙ্কা থেকে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। অযোধ্যায় ফিরে এলে রামচন্দ্রের রাজ্য অভিষেক করা হয়। রামচন্দ্র তখন তার পত্নী সীতার সঙ্গে প্রজা কল্যানে রামরাজ্য স্থাপনের জন্য কার্তিক মাসের শুক্ল ষষ্ঠীতে সূর্যের উপাসনা করেছিলেন। মহাভারতের কাহিনীতেও ছট পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। পঞ্চ পান্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী কৌরবদের হাত থেকে হস্তিনা পুরের রাজপাট ফিরে পাবার জন্য সূর্যের উপাসনা করেছিলেন। এছাড়াও সূর্য পুত্র কর্ণ প্রত্যহ সকালবেলা স্নান সেরে অঙ্গরাজ্যের কল্যানে সূর্যের উপাসনা করতেন। ছট পূজার প্রচলন ছট শব্দটি ষষ্ঠ থেকে নেওয়া হয়েছে। বিহারি ভোজপুরি এবং মৈথিলী ভাষায় ষষ্ঠ কে ছঠি উচ্চারণ করা হয়। ছট পূজা হল মূলত সূর্য দেবের পূজা সূর্যের ছটা অথাৎ সূর্য কিরণকে এখানে ছঠি হয়ে গেছে। তাছাড়া ছট পূজায় ষষ্ঠীর দিনকেই ছট পূজার সন্ধ্যাকালীন অর্ঘ্য উৎসর্গের প্রধান দিন হিসাবে ধরা হয় তাই এখানে ষষ্ঠীর দিনটাকে ছয় দিন অথাৎ ছঠি ধরা হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের কাহিনীতে মা অন্নপূর্ণার ছট পূজা করার উল্লেখ পাওয়া যায়। একবার আষাঢ় মাসে বর্ষার আগমনে চাষিরা খেতে শস্য বুনে দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে বর্ষা ক্রমেই ক্ষীর্ণ হয়ে পড়ে তখন সূর্যের প্রবল দ্রাবদাহে মাঠ ঘাট পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। চাষীদের ঘরে অন্নাভাব শুরু হয়ে যায়। চাষিরা তখন মা অন্নপূর্ণার স্মরণ নেয়। মা অন্নপূর্ণা উপায় না দেখে সূর্য দেবের ধ্যান মগ্ন হন। কিন্তু সূর্য দেবের ধ্যান করে বিশেষ ফল পাওয়া যায় না,মা অন্নপূর্ণা সূর্যের প্রখর রোদ্রের তেজে জীর্ন দশা হয়ে যায়। তখন দেবতারা মা অন্নপূর্ণার করুন দশা দেখে সকলে মিলে সূর্যের স্মরনাপন্ন হয়। সূর্য দেব তখন মা অন্নপূর্ণাকে কার্তিক মাসের শুল্ক পক্ষে ষষ্ঠিতে গঙ্গা তীরে গিয়ে সূর্য উপাসনা করার বিধান দেন। এরপর মা অন্নপূর্ণা চাষিদের কল্যানে ভক্তিভরে গঙ্গাতীরে সূর্যের উপাসনা করেন এবং ধরণীকে পুনরায় শস্য শ্যামলা করে তোলেন এবং এইভাবে চাষীদের কষ্ট দূর করেন। সেই থেকে পরিবারের মহিলা প্রধানরাই মূলত পরিবার ও বিশ্বের কল্যানে ছট পূজার ব্রত করে থাকেন। ছট পূজার বিধিনিয়ম ও পূজা পদ্ধতি চতুর্দশীর দিন থেকে সপ্তমী পর্যন্ত মোট চার দিন বড়ই নিষ্ঠার সঙ্গে ছট ব্রত উপবাসীরা ছট পূজার ব্রত পালন করে থাকেন। যারা ছট পূজার ব্রত করেন তারা ভাইফোঁটার পরের দিন থেকেই নিরামিষ খাবার খাওয়া শুরু করেন। ছট পূজার প্রথম দিন : ছট পূজার প্রথম দিন মানে চতুর্দশীর দিন ছট ব্রতীরা শুদ্ধ বস্ত্রে ছট পূজার জন্য ব্রতী হয় এবং সেই দিন লবন ছাড়াই ছোলার ডাল,মিষ্টি কুমড়ো দিয়ে ভাত রান্না করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে প্রসাদ হিসাবে গ্রহণ করে। ছট পূজার দ্বিতীয় দিন : ছট পূজার দ্বিতীয় দিন অথাৎ পঞ্চমীর দিন হল খরনা ব্রত পালনের দিন। এই দিন থেকেই ছট পূজার নির্জলা ৩৬ ঘন্টার উপোস শুরু হয়। এই দিন ছট ব্রতী মহিলারা কাঠের আঁচে মাটির উনুনে গুড়ের পায়েস রান্না করে খেয়ে পড়ে ছট পূজা (ছট মাইয়ার ব্রত রাখে) এবং ঠেকুয়া,নাড়ু ইত্যাদি প্রসাদ তৈরী করে। ছট পূজার তৃতীয় দিন : ছট পূজার তৃতীয় দিন হল ষষ্ঠীর দিন। এই দিনে ছট ব্রতী মহিলারা সূর্যাস্তের সময় ডুবিত সূর্যকে গঙ্গা ঘাটে কিংবা বড় জলাশয়ে ধারে ধামা ভর্তি করে গোটা আখ গাছ, হলুদ গাছে এছাড়া পুজোর বিভিন্ন উপাদেয় সামগ্রী নিয়ে গিয়ে সূর্য দেবের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করেন। ছট পূজার চতুর্থ দিন : ছট পূজার চতুর্থ দিন হল সপ্তমীর দিন। এই দিন সকাল বেলা সূর্যোদয়ের সময় ছট ব্রতী মহিলারা তাদের পরিবারের সঙ্গে ছট ঘাটে গিয়ে সূর্যদেবকে অর্ঘ্য নিবেদন করে ছট উপবাস ভঙ্গ করে। তথ্য সূত্র : sonobangla.comছবি সৌজন্যে: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা