একজন কবির উপাখ্যানের কারনে বাঙালির প্রাচীন পুজা বাসন্তী পুজা তার গরিমা হারালো, জনপ্রিয় হোল অকাল বোধন। ইতিহাস কিন্তু তাই বলছে। বাল্মীকি অকালবোধনের পুজার কথা রামায়নে উল্লেখ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর বঙ্গ-রামায়ণে এই অংশের এমন আবেগমথিত বর্ণনা দেন যে, তা বরাবরের জন্যে বাঙালি জীবনে আর সংস্কৃতিতে গেঁথে যায়। শরৎকালের দুর্গাপুজো এইভাবেই ধীরে ধীরে নিজের নিজস্ব ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান রচনা করে সাধারণ মানুষের মধ্যে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে। উচ্চবিত্তিয় দের পুজা ছিল বাসন্তী পুজা বাঙালি তার আদি দুর্গাপুজোকে বা বাসন্তী পুজাকে কোনওদিনই পুরোপুরি ভুলে যায়নি। সে এখনও দুর্গাপুজোর আদিরূপ বাসন্তী পুজোর আয়োজন করে। যদিও এই পুজো মূলত জমিদার, নায়েব, গোমস্তা গোষ্ঠীর বড় এবং উচ্চবিত্তিয় লোকজনের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। পূর্বে এই পুজোর সঙ্গে ধন তন্ত্রের একটা প্রবল যোগ ছিল বলেই ধারনা। এখন অবশ্য এই পুজো পরিবার-তন্ত্রে আর আটকে নেই, বারোয়ারি পুজাই হয়ে উঠেছে। কেন এক সময় রমরম করে বাসন্তী পুজো হত উচ্চবিত্তিয় নব্য বাবুদের বাড়িতে, তার একটা অন্য কারণও আছে বলে অনেকের ধারনা। সেকালে অবিভক্ত বাংলাদেশ জুড়ে বসন্ত ঋতুর শেষে গ্রীষ্মের শুরুর এই সময়টায় বসন্ত রোগের খুব প্রকোপ ছিল। কোন ঔষধ পত্র তো ছিলই না টিকাহীন চিকিৎসাহীন সেই অতীতে সাংঘাতিক বসন্তের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য মায়ের আরাধনা করে মায়ের কৃপা প্রার্থনা করা হত। রোগকে প্রশমিত করার জন্য়ও তাই বাসন্তীদেবীর পুজোর চল হয়েছিল বলে মনে করেন অনেক গবেষকরা। পুরাণ এবং ইতিহাস অনুসারে বাসন্তী পুজোই বাঙালির আসল দুর্গাপুজো। অতীতে বারোয়ারি পুজোর রূপ না পেলেও এই পুজো এখনও অনেকের বাড়িতে, পাড়াতে, ক্লাবে আয়োজিত হয়। যদিও পরবর্তী কালে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দুর্গাপুজোই অন্যতম প্রধান পুজোর স্বীকৃতি পায়। অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য সব কালেই মানুষ আদ্যাশক্তির আরাধনা করেন। পুরাণ মতে বাসন্তী পুজার আখ্যান মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী গ্রন্থে বাসন্তী পূজার উল্লেখ রয়েছে। এই উপাখ্যান অনুযায়ী, সত্য যুগে রাজা সুরথ চন্দ্রবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি এই পৃথিবীর রাজা হয়েছিলেন। কিন্তু কাল বশে তিনি শ্ত্রুদের দ্বারা পরাজিত হয়ে রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে মনের দুঃখে এক গভীর বনে প্রবেশ করে। সেই গভীর বনে মেধস মুনির আশ্রমে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন রাজা সুরথ। আশ্রমে থেকে মুকুটহীন রাজা সুরথ মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন, কীভাবে হারানো রাজ্য আবার ফিরে পাওয়া যায়। চিন্তিত রাজা সুরথ একদিন বনের মধ্যে পথ চলতে চলতে সমাধি নামের এক বৈশ্যের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। সেই বৈশ্যও নিজের ছেলে এবং আত্মীয়দের চক্রান্তে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই বৈশ্য সব সময়েই ছেলে এবং পরিবার পরিজনদের কথা ভেবে কষ্ট পেতেন। রাজা সুরথ বৈশ্যকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘যে পুত্র ও আত্মীয়রা ধনলোভে আপনাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল, তাদের প্রতি আপনার মন এখনও কেন স্নেহের উদ্রেক হচ্ছে কেন?’ বৈশ্য উত্তরে বলেন, ‘হে রাজন, আমিও বুঝি না, কেন ধনলোভি পুত্র আর আত্মীয়দের জন্য আমার মন স্নেহাসক্ত হচ্ছে।’ এরপর রাজা সুরথ এবং সমাধি উভয়েই শান্তি লাভের আশায় মেধস মুনির কাছে এসে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি ও সমাধি উভয়েই ধনলোভী নিষ্ঠুর স্বজনগণ ও ভৃত্যগণ কর্তৃক বিতাড়িত হয়েও আমাদের মন তাদের প্রতি স্নেহাসক্ত হচ্ছে কেন? এর কারন কী? আমাদের শক্তি লাভের পথ কী?’ তখন মেধস মুনি তাঁদের কাছে জগতের সব বিষয়ের অসারতা সম্বন্ধে উপদেশ দেন এবং দেবী আদ্যাশক্তির শরণাপন্ন হওয়ার নির্দেশ দেন। মেধস মুনির উপদেশে রাজা সুরথ ও সমাধি বন মধ্যস্থিত নদীর তীরে শ্রীশ্রীচণ্ডীস্বরূপা দুর্গাদেবীর মৃন্ময়ী প্রতিমা গড়ে তিন বছর উপবাস থেকে পূজা সাঙ্গ করলে দেবী দুর্গা-চণ্ডীকা সন্তুষ্ট হয়ে তাঁদের বর প্রদান করেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি, নদী তীরবর্তী মেধসাশ্রমে বসন্ত কালেই শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা সমাপন করে দেবী প্রতিমা নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়েছিলেন। যা পরে বাসন্তী পুজা নামে প্রসিদ্ধ হয় এবং সেটাই প্রচলিত থাকে। অকালবোধন কিন্তু রামচন্দ্র রাবণকে পরাস্ত করে সীতা-উদ্ধার কালে অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য শরৎকালে দুর্গার আরাধনা করলেন। সেই সময় সূর্যের দক্ষিণায়ন এবং দেবতাদের নিদ্রার সময়। এই অকালে দেবীর ঘুম ভাঙানো হল বলে এটি অকালবোধন হিসাবে বিখ্যাত হল। শরৎ নবরাত্রিতে দুর্গাপুজো হয় আর এই বসন্তের নবরাত্রিতে হয় বাসন্তী পুজো। কোথায় ছিল মেধস মুনির আশ্রম! শক্তি মঙ্গল তন্ত্রানুসারে সুদূর অতীতে বিন্ধ্যাচল থেকে বাংলাদেশের চট্টলভূমি পর্যন্ত প্রদেশ বিষ্ণুক্রান্তা নামে বিখ্যাত ছিল। পাল রাজাদের সময়ে সমগ্র বাংলায় অধুনা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ তন্ত্রের বিপুল প্রভাব ছিল। পরে এই তন্ত্রবিদ্যা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ‘গৌড়ে প্রকাশিত বিদ্যা’ এ বাক্যটিই ইঙ্গিত করে, শ্রীশ্রীচণ্ডীর উৎপত্তি স্থান বাংলাদেশে। আবার দেখা যায়, দেবীর একান্ন পীঠের অধিকসংখ্যক পীঠ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে পড়েছে। সংখ্যার দিক দিয়ে মোট আটটি দেবীপীঠ বাংলাদেশে অবস্থিত। এর মধ্যে দুটি পীঠ চট্টলভূমিতে। অতীতে বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূভাগ দীর্ঘকাল জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। এসব জঙ্গলের আদিম অধিবাসীদের ‘কিরাত’ বা শবর বলা হতো। কাদম্বরী, হরিবংশ, দশ কুমার চরিত, ভবিষোত্তর পুরাণ, কালিকা পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থের অভিমত এই যে শ্রীশ্রীচণ্ডী বর্ণিত দেবী দুর্গা ‘কিরাত’ বা শবরগণেরই উপাস্য দেবী ছিলেন। সুতরাং কিরাত দেশ তথা বাংলাদেশেই চণ্ডী দুর্গার আবির্ভাব স্থলরূপে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের বাসন্তী পুজা এখনও সারা বাংলাতেই ইতস্তত বাসন্তী পুজার আয়োজন হয় বাংলাদেশে, কাছাড়, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি জায়গায়। বাসন্তী পুজা এখন সার্বজনীন রুপ পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বেরাচাপা, দেগঙ্গা, বারাসাত, বসিরহাট ইত্যাদি অঞ্চলে এই পুজা এখন যথেষ্ট চাকচিক্যের সঙ্গেই হয়ে থাকে। ত্রিপুরার রাজবাড়ির বাসন্তী পুজা হয়ে থাকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়। দেবীর পুজা শেষে পুলিশ ব্যান্ড সহযোগে যথেষ্ট নিয়ম নিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে দেবী বাসন্তীর ভাসান পর্ব সম্পন্ন হয়। চারদিন ধরে চলে এই পূজানুষ্ঠান, যাগযজ্ঞ। মেলাও বসে। গ্রামে গ্রামান্তরে এখনও দেবী দুর্গার মতোই দেবী বাসন্তী পুজিত হন সমধিক উৎসাহে। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণের আখ্যানের কারনে অধিক পরিচিতি পেয়ে যান শরতের অকাল বোধন বা দুর্গা পুজা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)তথ্য সুত্রঃ রামায়ন এবং সমসাময়িক প্ত্র-পত্রিকা।ছবি সৌজন্যে: আনন্দবাজার