ত্রিপুরা সরকারের দেয়া সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ত্রিপুরায় গড়ে প্রতিদিন দু’জন মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন এইডসে। সংখ্যাটা ক্রমশ বাড়ছে। শুধু ত্রিপুরা নয়, উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যলেঞ্জ এইডস কে ঠেকানো। শুধুমাত্র উত্তরপূর্ব ভারতেই নয়, সমগ্র ভারতবর্ষেই এইডস থেকে মুক্তি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের যুব সম্প্রদায় আধুনিকতায় অভ্যস্থ কিন্তু এখনও উন্নাসিক এইডস সম্পর্কে। পরিবেশ সম্পর্কে। প্রতি বছর শুধুমাত্র বায়ু দূষণের কারনেই কমপক্ষে ছয় লক্ষ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আরও কয়েক লক্ষ মানুষ জল দূষণ, শব্দ দূষণের শিকার। এর পাশাপাশি অসুরক্ষিত যৌন জীবন উপভোগ এবং অজ্ঞানতার কারনে আরও কয়েক লক্ষ মানুষ আজ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে সারা বিশ্বে। এর কারন এইডস। এইডসের ইতিহাস ১৯৭৯ আমেরিকা এবং আফ্রিকার কিছু যুবকের দেহে ‘কাপোসিস সারকোমা’ (Kaposis Sarcoma) নামে বিশেষ এক ধরনের টিউমার লক্ষ করা যায়। তাছাড়া কতিপয় যুবকের দেহে বিশেষ ধরনের নিউমোনিয়া পরিলক্ষিত হয়। চিকিৎসকরা দেখলেন, ঐ সমস্ত রোগীর দেহে অন্য রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা সিদ্ধান্তে পৌঁছুলেন, ঐ যুবকরা মারণ ব্যাধি এইডসে আক্রান্ত। পাশাপাশি চিকিৎসকরা দেখলেন যে এইডসে আক্রান্ত ঐ যুবকরা হয়তো সমকামী অথবা তাদের জীবনে বহু যৌন সঙ্গী বা সঙ্গিনী রয়েছে। অথবা তারা মাদকাসক্ত। শুধু আমেরিকা ও আফ্রিকাতেই নয়। ঐ বছরের গোড়ার দিকে তাঞ্জানিয়া, উগান্ডা, জাইরেতে এই রোগের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা গেল। রোগের লক্ষণ হিসেবে দেখা গেল, আক্রান্ত রোগীর লসিকা গ্রন্থি গুলি ফুলে উঠছে। তারা এলজি -৩৬ নামক যৌন রোগে ভুগছে। কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি উদরাময় এবং মুখে ছত্রাকের আক্রমণে কাহিল। এরই মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিল। সমগ্র বিশ্বের প্রখ্যাত চিকিৎসক, বিজ্ঞানীরা এর কারন অনুসন্ধানে গবেষণা শুরু করলেন। এইডস-এর আবিস্কার অধ্যাপক Hewrd Temin এবং অধ্যাপক David Baltimore আবিস্কার করলেন রেট্রো ভাইরাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ Enzyme RT-র। সুচিত হলো এইচ আই ভি আবিস্কারের প্রথম ধাপ। একথা ঠিক এই মারণব্যাধি ১৯৫০ সালেও ছিল কিন্তু আবিস্কার হয়নি বলে বিশ্ববাসী এই রোগের নাম জানতেন না। AIDS চার অক্ষরের ইংরেজি শব্দ। এইডস-এর মানে হলো, ‘A’ অর্থাৎ অ্যাকোয়ার্ড বাংলায় অর্জিত, ‘I’ অর্থাৎ ইমিউন অর্থাৎ দেহের সহজাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ‘D’ ডেফিসিয়েন্সি অর্থাৎ অভাবজনিত, ‘S’ সিন্ড্রোম অর্থাৎ বিভিন্ন রোগের লক্ষণগুলির প্রকাশ। এইডস রোগের লক্ষণগুলি কাপোসিস সারকোমা নিউমেসিস্টিক কেরিনাইনিউমোনিয়া প্রমস্তিক টক্সরোপ্লাজমতা কণ্ঠনালীতে ক্যান্ডিভাল চোখের রেটিনায় সাইটোমেগালো ভাইরাস সংক্রমণ লিম্ফইন্টারস্টিশিয়াল নিউমোনিয়া (শিশুদের ক্ষেত্রে বেশী দেখা যায়) । এইডসের বৈশিষ্টমূলক লক্ষণ সমূহ মুখের গহ্বরে ক্যান্ডিডাল সংক্রমণ জিহ্বাতে লোমশ আস্তরণ ক্রিপ্টোকক্কাস জনিত মেনেনজাইটিস ফুসফুসের বাইরে স্নায়ুতন্ত্রে এবং অন্যান্য অঙ্গে টিবির সংক্রমণ শরীরের চামড়ায় হরিস্পড ভাইরাসের সংক্রমণ চামড়ায় চুলকানি সহ ফুসকুড়ি মুখগহ্বরের বাইরে ত্বক ও অন্যান্য স্থানে কাপোসিস সারকোমার উপস্থিতি গ্রন্থির বাইরে B-Cell লিম্ফোসা টিউমার স্নায়ুতন্ত্রের নিস্ক্রিয়তা কিভাবে এইডস ছড়ায় রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে ইঞ্জেকশানের সূচের মাধ্যমে শিরায় মাদক দ্রব্য (ড্রাগস) গ্রহণের মাধ্যমে মা থেকে শিশুতে অবাধ ও অবৈধ যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতস্থান সুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে আশার কারনে কিভাবে এইডস ছড়ায় না দৈহিক ঘনিষ্ঠতায় যেমন গৃহস্থালির কাজকর্মে, শ্বাসপথে, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে, একই যানবাহনে ভ্রমণে, বিদ্যালয়ে খেলাধুলোতে। ব্যাক্তিগত সংস্পর্শে, করমর্দনে, আলিঙ্গনে, মুখে, হাতে কপালে চুম্বনের মাধ্যমে মিলিত ব্যাবহারে- শৌচাগার, জলাশয়, সাঁতারের জলাশয়, পরিধেয় বস্ত্র, টেলিফোনের হাতল, কাজের যন্ত্রপাতি ইত্যাদিতে কামড়ালে- মশা, ছারপোকা বা অন্যান্য জীবজন্ত বা কীটপতঙ্গ কামড়ালে। কিভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই মারনব্যাধির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে রক্ত সঞ্চালনের সময় রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া একজনের ব্যবহৃত সূচ বা সিরিঞ্জ অন্যের ক্ষেত্রে ব্যাবহার না করা শিরায় ড্রাগ গ্রহণ না করা এইডস আক্রান্ত মায়ের গর্ভধারণ না করা যৌন সম্পর্ক শুধুমাত্র একজন সঙ্গীর সাথেই হওয়া বাঞ্ছনীয় যৌনক্রীড়ার সময় কনডম ব্যবহার করা সর্বোপরি জন সচেতনতা বৃদ্ধি করা এইডসের অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু। সাধারণ জনগণের সাথে সাথে স্বাস্থ্য কর্মীদের মধ্যেও এইডস নিয়ে সচেতনতা দরকার। প্রয়োজন ছাত্রশিক্ষক থেকে শুরু করে সমাজকর্মী দের সম্মিলিত প্রয়াস। তাহলেই সম্ভব এইডস মুক্ত বিশ্ব গড়া। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ এইডস কন্ট্রোল সোসাইটি