পৃথিবীর প্রথম উপন্যাসের নাম গিলগামেশ, যা প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় লেখা হয়েছিল। মেসোপটেমিয়া ছিল বর্তমানের ইরাক আর সিরিয়া যেখানে রয়েছে সেই অঞ্চল জুড়ে। লেখকের নাম জানা যায়নি। বইটা কেন লেখা হয়েছিল, কে তার পাঠক ছিল, সেসবও কেউ জানে না। বইটি ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে মাটির ফলকে। পৃথিবীর প্রাচীনতম বর্ণমালা কিউনিফর্মে লেখা হয়েছিল বইটি। এই নাম এসেছে অক্ষরগুলোর আকার থেকে। তখনকার লিপিকারেরা কাদামাটির ওপর নলখাগড়া দিয়ে কীলক খোদাই করে লিখতেন। হাজার হাজার বছর ধরে কেউ এই লেখা পড়তে পারেনি। ১৮৭০ সালে জর্জ স্মিথ নামে লন্ডনের এক শ্রমজীবী মানুষ ব্রিটিশ জাদুঘরের এই মাটির ফলক দেখতে দেখতে তার পাঠোদ্ধার করেন। বিশেষজ্ঞদের দাবী এটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস। কিন্তু রহস্যজনক বইয়ের তকমা কিন্তু ছিনিয়ে নিয়েছে, ‘দ্য ভয়ানিচ ম্যান্সস্ক্রিপ্ট’। কি আছে সেই বইয়ে! দ্য ভয়ানিচ ম্যান্সস্ক্রিপ্ট ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১২ ক্রিস্টাব্দে পোল্যান্ডের একজন বড় ব্যবসায়ী আলফ্রেড ভয়ানিচ প্রথম এই বইটি উদ্ধার করেন। কোথা থেকে এই বই উদ্ধার হোল সে বিষয়ে কোন তথ্য জানা যায়নি। এই বইটি এমন একটি বই ছিল যা দিয়ে হয়তো পৃথিবীর অনেক অজানা তথ্য এবং সঙ্কেত আবিষ্কার বা উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে ধরে নিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। বলা যায় বইটি নিজেই অজানা এক রহস্য হয়ে দাড়ায়। এই বইটিতে এমন কিছু ইঙ্গিত দেয়া আছে যা দেখে অনুমান করা হয়েছে, বইটি অনাবিষ্কৃত অনেক বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের যুক্তিসম্মত উত্তর দিতে সক্ষম। এই বইটিতে বিশেষ কিছু রহস্যে ভরা বিষয়কে লেখা হয়েছে সাংকেতিক ভাষায় যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। এছাড়াও এই বইটিতে আমাদের এই অজানা পৃথিবীর বিভিন্ন বিষয়গুলি যেমন, মানুষের জীবনের রহস্য, জন্ম রহস্য, গ্রহ নক্ষত্র, মহাকাশ, মানুষের জীবনশৈলী, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়েও অনেক অজানা তথ্য রয়েছে। কিন্তু এই তথ্যগুলি কিছু বিচিত্র ভাষার সাংকেতিক রূপে লেখা ছিল এই বইয়ে। বিচিত্র সাঙ্কেতিক ভাষার রহস্য এমন প্রাচীন বইগুলিতে বিচিত্র সাংকেতিক ভাষার লেখা পাওয়া নতুন কোনো বিষয় ছিল না। ক্রিপ্টোগ্রাফাররা এই ধরণের কাজ প্রায়ই করে থাকেন। যারা এমন পুরাতন বইগুলিতে খুঁজে পাওয়া ভাষা বোঝার চেষ্টা করেন তাদেরকেই ক্রিপ্টোগ্রাফার বলা হয়। এই বইটি সুন্দর আর উজ্জ্বল কিছু ছবিতে বেশ পরিপাটি এবং যত্নের সঙ্গে সাজানো ছিল। কিন্তু একটি জিনিস যা কেউ বুঝতে পারছিল না, বইটি এমন এক অক্ষরগুলি দিয়ে লিখা হয়েছে যা কখনোই আগে দেখা যায় নি আর খুব বিচিত্র। অদ্ভূত সব চিহ্ন এবং ভাষা বোঝার জন্য ভয়ানিচ নিজের সারা জীবন অতিবাহিত করেছেন কিন্তু তিনি এই বইটির একটি অক্ষরও উদ্ধার করতে সক্ষম হননি। কি আছে বইটিতে? আলফ্রেড ভয়ানিচের মৃত্যুর পর বইটি বিশ্ববিদ্যায়লয়ের লাইব্রেরির এক গুপ্ত জায়গায় রাখা হয়। সেই বিশ্ব বিদ্যালয়ে অনেক ভাষাবিদ এবং বিশেজ্ঞরা চেষ্টা করেছেন বইটির গোপন রহস্য উন্মোচন করার। ১০ লাখের বেশি ছবির ব্যাখ্যা, ১.৭০ লাখের বেশি ক্যারেক্টার দিয়ে ভরে রাখা এই বই তাদের সব চেষ্টাতেই জল ঢেলে দেয়। প্রথম দেখায় সবার মনে হয়েছিল বইটিকে ডিকোড করা খুব একটা কঠিন হবে না, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পারে তাদের ধারণা কতটা ভুল। বইটিতে কিছু ফুলের ছবি আছে, জোডিয়াক চার্ট আছে, আর যা কিছু ছবি আছে তা প্রাকৃতিক আকারের সঙ্গে মিলে যায়। আর মধ্য কিছু ছবি অপটিক্যাল ইলুশনের কাজ করে। যখনি এই ছবি গুলির মধ্যে গতি দেয়া যায় এটি একটি চলমান ভিডিওর মতো কাজ করে। আরো কিছু ছবি আছে যেখানে মেয়েরা বিশেষ কিছু তরলের মধ্য স্নান করছে। হয়তো স্নানের জলে মিশে আছে কোন প্রাকৃতিক উপাদান। যা মেয়েদের চির সৌন্দর্য ধরে রাখতে সাহায্য করবে। তাছাড়া অন্যকিছু ছবিতে ঔষুধপত্র কিভাবে তৈরি করতে হয় তার ব্যাখ্যা দেয়া আছে। এইসব কিছু দেখে যে কোনো সাধারণ মানুষের মনে হবে এটি একটি বিজ্ঞান বিষয়ক বই। কিন্তু রহস্য অন্য কোথাও। কোন কোন গবেষকের ধারনা এই বইয়ের লেখক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু গুপ্ত আবিষ্কার সারা পৃথিবী থেকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বইটির লেখক কে ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আলফ্রেড ভয়ানিচ নিজেই খুঁজতে চেয়েছেন। একদিন তিনি বইটি অধ্যায়ন করার সময় আল্ট্রাভায়োলেট রশ্নির মাধ্যমে কিছু লেখা দেখতে পেলেন, যে শব্দগুলি খালি চোখে দেখা যাচ্ছিল না। বইটির প্রথম পৃষ্টায় পাওয়া লেখাটি ছিল “জ্যাকবস সিন্যাপিউস“। জ্যাকবস সিন্যাপিউস ১৭ শতাব্দীর চেক রিপাব্লিকের রাজা “২য় রুডলফ” এর ব্যাক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। ওই সময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভুত বিকাশ শুরু হয়েছিল, যাকে বলা হতো আলকেমি। এটা খুবই গোপন বিষয় ছিল। আর সে সময় পাওয়া যাওয়া রেয়ার বা বিরলতম ঔশুধি গুলি দুনিয়া থেকে লুকিয়ে রাখা হতো। তবে কি সত্যিই জ্যাকবস সিন্যাপিউস এই বইয়ের লেখক ছিলেন! গবেষকদের এটা কখনোই মনে হয়নি যে, সত্যিই জ্যাকবস সিন্যাপিউস এই বইয়ের লেখক ছিলেন। কারণ ১৭ শতাব্দীতে গাছপালা বিষয়ক এনাটমি বিদ্যার বিস্তারিত ব্যাখ্যা মানুষ আবিষ্কার করেছিল। আর এই বইটিতে যে ধরণের গাছপালার ছবি এবং তার ব্যাখ্যা দেওয়া আছে তা ছিল আরও অনেক পুরনো। এতেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল হয়তো জ্যাকবস সিন্যাপিউস এই বইটির লেখক ছিলেন না কিন্তু তিনি এই বইটিকে নিজের কাছে অবশ্যই রেখেছিলেন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এই বইটি থেকে পাওয়া গিয়েছে, তা হচ্ছে ১৬৬৫ ক্রিস্টাব্দে লেখা একটি পত্র। পত্রটি লিখেছিলেন পোহিনিয়ান বিজ্ঞানী “জোহানেস মার্কাস মার্সি“। তিনি এমন একজন বিজ্ঞানী ছিলেন যিনি প্রায় পৃথিবীর সমস্ত ভাষা জানতেন। বইটি তার কাছে পাঠানো হয়েছিল অনুবাদ করার জন্য। ওই পত্রটিতে বইটির লেখকের নাম বলা হয়েছিল “রজার বেকন“। রজার বেকন ১৩শ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের একজন ধর্মযাজক ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রকৃত অর্থেই বিজ্ঞান বিষয়ে প্রভাবিত ছিলেন। অনুমান করা হয় সমকালীন বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন শ্রেষ্ঠ। এই জন্যই উনাকে বেশ কয়েকবার জেল এ বন্দী করেও রাখা হয়। রংধনু কিভাবে সৃষ্টি হয়, আলো কিভাবে প্ৰতিফলিত হয় এসবের ব্যাখ্যা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন। আর ওই সময় তিনি একটি হালকা ক্ষমতাযুক্ত মাইক্রোস্ক্রপও তৈরি করেছিলেন। আর এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না যে ‘দি ভয়ানিচ মানসস্ক্রিপ্ট’ বইটিতেও এমন অনেক ছবি বা শব্দ ছিল যা মাইক্রোস্ক্রপ দিয়ে দেখা যেত। এই কারণেই সম্ভবত তিনি তার আবিষ্কারকে এমন ভাবে এক গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু রহস্য এখনও রয়ে গেছে, কে এই বইয়ের লেখক। এই বইয়ের লিপি ছবি কে পাঠোদ্ধার করবে! বা আদৌ কি কোনদিন সম্ভব হবে পাঠোদ্ধার! বইটির কার্বন ডেটিং থেকে কিন্তু স্পষ্ট বইটি এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বই এবং এর বিষয় সত্যিই হয়তো বিজ্ঞানের নতুন কোন রহস্যের সন্ধান দেবে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া।