কোভিড দ্বিতীয় ঢেউয়ে ত্রস্ত দেশ। চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO বারবার জানাচ্ছে এই কোভিড ১৯ থেকে বাঁচাতে পারে আমাদের শুধু মাস্ক বা মুখোশ আর স্যোসাল ডিস্টেন্স বা সামাজিক দূরত্ব। কিন্তু কে কার কথা শোনে! গ্রামাঞ্চলে অন্ধ বিশ্বাস, কোভিড বলে কিছু নেই। সব ঈশ্বরের, ভগবানের খেইল। কল্কী অবতার হয়ে আসবেন, এবং পৃথিবীকে বাঁচাবেন। গ্রামে-গঞ্জে, মহল্লায় কোভিড বিধির তোয়াক্কা না করেই চলছে পূজানুষ্ঠান। এই অবস্থা কিন্তু আজ নতুন কিছু নয়। প্রতি একশ বছরে দেশে মহামারীর ইতিহাস আছে। আর মাস্কের ইতিহাস আরও প্রাচীন। আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এমনকি কৃষি জীবনের সাথেও কয়েক শতক ধরে জুড়ে আছে মাস্ক। এখনও মাঠে ঘাটে দেখা যায় কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে আছে ফসল ভর্তি মাঠে। রক্ষা করছে গৃহস্থের ফসল। মুখোশচিত্র, বাংলার লোক কারুশিল্পের ঐতিহ্য মুখোশচিত্র, বাংলার লোক কারুশিল্পের ঐতিহ্যের এক অনন্য শৈল্পিক অংশ। বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একটি মূল্যবান সম্পদও বটে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘দেশের লোকসংস্কৃতির মধ্যে অতীত যুগের সংস্কৃতির বহু নিদর্শন আজ সংযুক্ত আছে, মুখোশচিত্র শিল্প সেগুলোর অন্যতম। এটি আমাদের জাতির পূর্ণাঙ্গ লোকসংস্কৃতির মূল্যবান উপকরণ’। মানব সমাজের মুখোশচিত্র সম্পর্কিত শিক্ষার তথ্য ও তত্ত্ব সংবলিত বিষয়কে সাধারণ অর্থে মুখোশচিত্রের ইতিহাস বলা হয়। মুখোশচিত্র গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের সৃষ্টি। চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত মুখোশ মুখে লাগিয়ে মঞ্চে অভিনয় ও পূজা-পার্বণে নৃত্য পরিবেশিত হয়। যে কোনো অনুষ্ঠানে নৃত্য-অভিনয়ের সঙ্গে মুখোশের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে নানাভাবে মুখোশের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশের গ্রামের বিভিন্ন মেলায় বা যাত্রানুষ্ঠানে, চৈত্রসংক্রান্তিতে নৃত্যের আয়োজন হতো, সেই মেলায় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পসরা সাজানো হতো নানা ধরনের মুখোশ দিয়ে। অনেক ধরনের মুখোশ আছে যেগুলোকে খেলনা জাতীয় মুখোশ বলা যেতে পারে। আবার অনেক মুখোশ আছে যা নৃত্য, অভিনয় এবং পূজা-পার্বণে ব্যবহার করা হয়। মুখোশচিত্রের প্রতিটি শিল্পীই তাদের তৈরি মুখোশকে সামান্য রদবদল করে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করে। যেমন- বাঘ, ভালুক, বানর, দেবদেবী ইত্যাদি। আর এসবই শিল্পীর হাতের সৃষ্ট কলাকৌশল। মুখোশের প্রকারভেদ এবং উদ্দেশ্য অদৃশ্য ও কল্পিত বিষয়কে মুখোশে প্রকাশ করা হয় যা মঙ্গল বা অমঙ্গল বাচক ঐন্দ্রিজালিকতা সৃষ্টির জন্য। মুখোশচিত্রকে ৭টি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। পৌরাণিকী মুখোশ, লোকায়ত মুখোশ, গ্রামীণ মুখোশ, প্রাণী মুখোশ, সামাজিক মুখোশ, মিশ্র মুখোশ এবং অন্যান্য মুখোশ। লোকজ আচার অনুষ্ঠানে লোকনৃত্য মুখোশের ব্যবহারের মূলে রয়েছে আবহমান গ্রামবাংলার নর-নারীর নানা অভিব্যক্তি যেমন- বীরত্বব্যঞ্জক, কামভাব বা সম্মোহন ভাবের প্রকাশ, এছাড়া নানা কুপ্রভাব দূরীকরণে লোকসমাজের যুগ যুগান্তরের সংস্কার ও বিশ্বাস অনুযায়ী আচার-অনুষ্ঠানে বিভিন্ন লোকজ নৃত্য প্রভৃতি ছাড়াও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মুখোশচিত্র তৈরি হয়েছে।মুখোশ সামাজিক বা ধর্মীয় ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও শক্তি সাধনার স্বরূপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাছাড়া লৌকিক ও পৌরাণিক গল্পগুলো হাসি তামাশা বিদ্রূপ ভয়ভীতির জন্যও মুখোশ মুখে লাগিয়ে নৃত্য এবং অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান। সভ্যতার আদি স্তরে শক্তিকে বশ করার প্রয়োজনে ও পরে সামাজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিশুদের খেলনা হিসেবেও মুখোশচিত্র ব্যবহৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন আসে মুখোশচিত্রের উৎপত্তি হল কিভাবে। মানুষের আদিযুগের বর্বর দশা থেকেই তার লোককারুশিল্পে মুখোশ তৈরির কৌশল শিক্ষার সূত্রপাত। নৃতত্ত্ববিদ, পুরাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের প্রচেষ্টায় আদিযুগের মানুষরা প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করার অদম্য ইচ্ছায় বুদ্ধির সাহায্যে নানা উপায় ও কৌশল আবিষ্কার করেছিল এবং এ কৌশলগুলো তারা তাদের উত্তর পুরুষদের শিখিয়ে দিত। সম্ভবত লোককারুশিল্পে এভাবেই বংশানুক্রমে মুখোশচিত্রের উৎপত্তি হয়েছিল। বাংলার মুখোশ শিল্প বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই লোককারুশিল্পের মুখোশের প্রচলন ছিল। ঢাকা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, বগুড়া, রংপুর প্রভৃতি অঞ্চলে আজও কিছু কিছু মুখোশের প্রচলন কোনো রকম টিকে আছে। এসব অঞ্চলের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোককারুশিল্প ফাউন্ডেশনে লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবগুলোসহ অন্যান্য মেলা-পার্বণে মুখোশ পরীলক্ষিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইস্টটিটিউটের ছাত্রছাত্রীরা বৈশাখের উৎসবে বিভিন্ন মুখোশচিত্র তৈরি করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহকারে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন করে থাকে। পাশাপাশি উচ্চবিত্ত পরিবারের বাসাবাড়ির দেয়ালে শোভা পায় এ মুখোশচিত্র। মুখোশ তৈরির উপকরণ মুখোশ কাঠ, কাগজ, মাটি, বেত, শোলা ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। মুখোশ তৈরিতে লাল, নীল, হলুদ এবং কালো রং প্রধান। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে মালাকার, পাল, কুমার, আচার্য এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী শিল্পী মুখোশ তৈরি করে থাকেন। মুখোশ তৈরি করতে গ্রামবাংলার দেবদেবীর মুখাকৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের পশুপ্রাণীর মুখের মতো তৈরি করে যা ডাইস বা ছাপ হিসেবে পরিচিত তার ওপর মুখোশের কাঠ ও বেত পোঠা তৈরি করে নিতে হয়। পরে এগুলো শিল্পীরা হাতে টিপে টিপে দেবদেবীর কিংবা পশু আকৃতির মুখোশ তৈরি করেন। যেমন- মুণ্ড মূর্তির মুখোশ, ওলাই চণ্ডীর মুখোশ, বড়াম চণ্ডীর মুখোশ, বড়খা গাজীর মুখোশ, ধর্ম ঠাকুরের মুখোশ, সত্য নারায়ণ সত্য পীরের মুখোশ, পীর গোড়া চাঁদের মুখোশ, ওলা বিবির মুখোশ, ভৈরবের মুখোশ, ঘাটু দেবতার মুখোশ, মানিক পীরের মুখোশ ইত্যাদি। মুখোশ শিল্পের বর্তমান অবস্থা মুখোশচিত্র এখন লুপ্তপ্রায়। মুখোশচিত্র ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের প্রয়োজনে তৈরি করেন। বংশানুক্রমে পারিবারিক শিল্পের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে এ শিল্পে। তারা এ মুখোশচিত্র তৈরি করতে মাটি, কাগজ ও শোলার দ্বারা বংশানুক্রমে মুখোশচিত্র তৈরি করার কৌশল শিখেছেন। আজ কোনো রকমে অল্প সংখ্যক শিল্পি টিকে আছেন। আসলেই মুখোশচিত্র এখন লুপ্তপ্রায়। অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মুখোশচিত্র শিল্প আস্তে আস্তে তাদের প্রাধান্য হারিয়ে ফেলেছে। ফলে, ঐতিহ্যবাহী মুখোশ শিল্পটি লুপ্ত হতে চলেছে। মুখোশচিত্রের শিল্পীরা এখন কালের বিবর্তনের সঙ্গে মুখোশচিত্রের পাশাপাশি তৈরি করেছেন শোলার আধুনিক কাজ এবং শখের হাঁড়িসহ অন্যান্য কাজ। তার কারণ বাঙালির চিরায়ত বিভিন্ন উৎসব ব্যতিত মুখোশচিত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় না। তাই মুখোশচিত্র শিল্পীরা অন্যান্য শিল্পের সঙ্গে এ মুখোশচিত্রটিকে ধরে রেখেছে। আমাদের লোককারুশিল্পে মুখোশচিত্রের সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রদর্শন শুধু জাদুঘরে কিংবা বিভিন্ন মেলা উৎসবে সীমাবদ্ধ না রেখে এ কাজে জড়িত শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে এ শিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক পত্রপত্রিকা এবং মুখোশ শিল্পের ইতিহাস।