দুই দেশের কূটনীতিক সম্পর্কে ফলের আছে এক মজার ইতিহাস। এই ইতিহাস লাখ লাখ বছরের। একটা সময় পৃথিবীতে মিষ্টি সুস্বাদু ফল পাওয়া যেতো না বললেই চলে। তাই সামান্য যে কয়টি ফল পাওয়া যেতো সেগুলি ছিল রাজাদের জন্য। কোন কোন ফল জড়িয়ে আছে বিজ্ঞানের সৃষ্টির সঙ্গে, কোন কোন ফলের নাম হয়েছে আবার পাখিদের নামে। কোন কোন ফল ছিল ঈশ্বরের ডান। কোন কোন ফল আবার অন্ধবিশ্বাসে ভরপুর। কোন কোন ফল রাজ প্রাসাদে অলঙ্কার। এক সময় ফল সবাই কিনতে পারতেন না, তাই মান রক্ষায় ভাড়া পাওয়া যেত ফল। সব মিলিয়ে ফলের মজার সব ইতিহাস নিয়ে আছে চমকপ্রদ সব গল্প। তাই উৎসবে, সাধারণ সময়ে, পূজায়, বিয়ে এমনকি দুই রাষ্ট্রের কূটনীতিতেও কিন্তু আজকাল ফলের উপস্থিতি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। শুধু তাই নয়, ফলে ভিটামিন আছে, খনিজ আছে, আরো কত কী পুষ্টি গুণ। তবে খুব পরিচিত ফলগুলোর যে কিছু মজার মজার ইতিহাসও রয়েছে সেটাই আজ জেনে নেবো এই প্রতিবেদনে। দুস্প্রাপ্য আনারস এক সময় ভাড়ায় আনত মানুষ উত্তরপূর্বাঞ্চলের ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরা। ত্রিপুরার কুইন আনারসের কদর এখন বিশ্বজোড়া। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখন প্রতি বছর ত্রিপুরার আনারস পৌঁছে যায় আকাশ পথে। এই আনারস নিয়ে মানুষের ভালোলাগার শুরুটা অনেক আগের। মিষ্টি স্বাদের এই ফলটিকে সব অনুষ্ঠান আর উৎসবেই রাখা হতো সবসময়। তবে ইউরোপিয়ানদের হাতে আনারস আসে কলম্বাসের মাধ্যমে। কলম্বাস দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রায় আনারস খুঁজে পান। বেশ প্রাচীন আর আদিম এক গোত্রের মৃত কিছু মানুষের পাশে পড়ে ছিলো এই ফলটি। তবে সেসময় মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য খুব একটা সহজপ্রাপ্য না হওয়ায় আনারসকে রাজকীয় খাবার হিসেবেই ব্যবহার করা হতো। আমেরিকায় আনারস দিয়ে টেবিল সাজানোর ব্যাপারটা তো ছিলো রীতিমতো সৌভাগ্যের বিষয়। খাবার টেবিলে আনারস নারীদের কাছে অসম্ভব আরাধ্য একটি দ্রব্য ছিলো। এত বেশি দুষ্প্রাপ্য ছিলো ফলটি যে, একটা সময় আমেরিকায় ভাড়া দেওয়া হতো আনারস! সম্মানের বিষয় হওয়ায় নিজের অনুষ্ঠানে ভাড়া করে আনারস নিয়ে, সেটিকে দেখিয়ে, প্রশংসা কুড়িয়ে তারপর আবার ফিরিয়ে দেওয়ার একটা রেওয়াজটা বেশ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিলো সেই সময়। এখন অবশ্য আনারস ততটা দুস্প্রাপ্য নয়। কিউই- পাখীর থেকে ফলের নাম কিউই ফলের নাম আসলেই মনে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ডের কথা। কিন্তু যাত্রা শুরু হয় চীন থেকে। নিউজিল্যান্ডের আকাশে কিউই নামের এক প্রকার পাখি প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। আর সেই পাখির গায়ের সাথে এই কিউই ফলের অনেকটা মিল আছে বলেই এমন নামকরণ হয়েছে ফলটির। এইটুকু আমাদের অনেকেরই জানা। কিন্তু কিউই ফলের ইতিহাসটা আরো অনেক বড়। কত শত হাতই না ঘুরতে হয়েছে তাকে! কিউই ফলের যাত্রা শুরু হয় চীন থেকে। সেখানে ‘ম্যাকাউ পিচ’ নামে পরিচিত ফলটি বানরের খুব পছন্দের ফল ছিলো। পরবর্তীতে, ইংলিশরা এর নাম দেয় ‘চাইনিজ গুজবেরি’। কারণ কি এই নামের পেছনে সেই সম্পর্কে কারও কিছু জানা নেই! বিংশ শতাব্দীতে নিউজিল্যান্ডের এক কলেজ প্রধান চীন থেকে এই ফলের কিছু বীজ নিয়ে আসেন। ‘চাইনিজ গুজবেরি’ চলে আসে চীন থেকে নিউজিল্যান্ডে। একটা সময় ফলটি রপ্তানি করা শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেসময় এর নাম বদলে ‘মেলোনেট’ রাখা হয়। নামটা অবশ্য কাররই খুব একটা পছন্দ হয়নি। পরে নিজেদের দেশের পাখির সাথে মিলিয়ে ফলের নাম রাখা হয়- ‘কিউই’। আর এখন? নিউজিল্যান্ডের বাৎসরিক প্রায় কয়েক কোটি টাকা আনতে সাহায্য করে এই কিউই ফল! টমেটো ছিল বিষ ইউরোপিয়ানদের কাছে হাস্যকর শোনালেও সত্যি যে, প্রায় দুই শতক ধরে টমেটোকে বিষাক্ত বলেই ভেবে এসেছিলো ইউরোপিয়ানরা। এতে অবশ্য তাদের খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। চমৎকার রঙ, বিষাক্ত ফলের সাথে বংশগত যোগাযোগ আর দুয়েকটা বিচ্ছিন্ন মৃত্যুর ঘটনা, এই সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছিলো টমেটো সংক্রান্ত ভয়। তবে আমেরিকায় মোটেও এই ভীতি ছিলো না। প্রত্যন্ত কিছু গ্রাম বাদে সবাই খাবারে টমেটো ব্যবহার করতো। টমেটোর প্রথম আর প্রধান পরিচিতিটা হয় গৃহযুদ্ধের সময়। টমেটো খেতে সুস্বাদু এবং সেইসাথে একে জমিয়ে সংরক্ষণ করে রাখাটাও বেশ সহজ হওয়ায় যুদ্ধের সময় টমেটোর ব্যবহার বেড়ে যায়। যুদ্ধে অংশ নেয়া সৈনিকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে টমেটো। আর শেষমেশ, ১৮৮০ সালে ইতালিয়ানদের পিজ্জার মধ্য দিয়ে ইউরোপেও প্রবেশ করার সুযোগ পায় টমেটো। আপেল বিজ্ঞানের ফল নিউটন যখন আপেল গাছটির নীচে বসে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আবিস্কার করছেন তখন কি কেউ জানতো এই আপেল একদিন বিজ্ঞানের ফল নামেই পরিচিতি লাভ করবে! আপেল নিয়ে গল্পের শুরুটা অনেক প্রাচীন। নানারকম পৌরাণিক কাহিনী আর ধর্মীয় গ্রন্থে আপেলের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সেগুলোর কোনটাই বর্তমান আপেলের গল্প নয়। আমেরিকায় নতুন মানুষগুলোকে স্বাগত জানাতে জনি অ্যাপলসিড প্রচুর পরিমাণ আপেলের গাছ লাগায়। তবে তাতে করে খুব একটা লাভ হয়নি। আপেল খেতে কেউই বিশেষ পছন্দ করতো না সেসময়। কারণটা ছিলো আপেলের সহজলভ্যতা আর তিক্ততা। আজকের মতো সেই সময় আপেল এতো সুস্বাদু ছিলনা সেগুলোর বেশিরভাগ প্রজাতিই ছিলো স্বাদে তেতো এবং আকারে ছোট। পরবর্তীতে অনেক চেষ্টায় আপেলের মান বাড়ানো হয়। তবে খাওয়ার চাইতে বেশি ব্যবহার করা শুরু হয় অ্যাপল সাইডার হিসেবে। কমলার আবিস্কারক কলম্বাস কমলা ফল হিসেবে খুব যে জনপ্রিয় ছিলো, তা কিন্তু না। মনে করা হয় ভারত কিংবা চীনে প্রথম জন্ম নেয় এই কমলা গাছ। ত্রিপুরার জম্পুইহিলের কমলা ছিল একসময় প্রসিদ্ধ ফল। প্রথমদিকে অবশ্য এই ফলটিকে কেউ ‘কমলা’ বলে ডাকতো না। আপেলের সাথে সাদৃশ্য থাকায় ‘চাইনিজ আপেল’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলো কমলা। এমনকি খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ অব্দেও বিভিন্ন গ্রন্থে কমলার উল্লেখ পাওয়া যায়। কলম্বাস নিজের দ্বিতীয় সমুদ্র যাত্রায় কেবল আনারস নয়, কমলাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে এই গাছ সবার প্রথমে কলম্বাসই রোপন করেন বলে ধারণা করা হয়। তারপর আস্তে আস্তে পৃথিবীর সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে কমলা! স্ট্রবেরি ছিল রাজকীয় খাবার আজকে আমরা পথেঘাটে স্ট্রবেরি পড়ে থাকতে দেখি। স্ট্রবেরি, এখন অনেক সহজলভ্য। একটা সময় কিন্তু স্ট্রবেরি ছিলো রাজকীয় খাবার। স্ট্রবেরির জন্মস্থান একইসাথে ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকা। অবশ্য সেসময়ের স্ট্রবেরি কিন্তু ঠিক আজকের মতন ছিলো না। না ছিল এতো রসালো, না এতো বড়। সান কিংয়ের পরিকল্পনানুসারে রাজকীয় হস্তক্ষেপেই তৈরি হয় বর্তমান স্ট্রবেরির ইতিহাস। এরপর অবশ্য ফলটি ভ্রমণ করে অনেকটা পথ। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই ফ্রেজিয়ার নামে এক গুপ্তচরকে পাঠান চিলি আর পেরুর দুর্গ থেকে খবরাখবর নিতে। তার ইচ্ছে ছিলো স্পেনের সিংহাসন দখল করার। তবে ফ্রেজিয়ার কেবল খবরাখবরই নয়, সাথে করে কিছু স্ট্রবেরিও এনেছিলো সেবার। চিলিয়ান সেই স্ট্রবেরি অবশ্য এতো সহজে জন্ম নেয়নি ফ্রান্সে। আর তারপর? নতুন, পুরনো সবরকমের স্ট্রবেরি মিশে সুস্বাদু আর চমৎকার স্ট্রবেরির জন্ম দিলো। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং সমকালীন পত্রপত্রিকা