পৃথিবীর বিখ্যাত নারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে গেলে শেষ হবেনা। তবে বিজ্ঞান থেকে শুরু করে মহাকাশ, সমুদ্র, পাহাড় জয় করা অসংখ্য নারীরা আজ পৃথিবী বিখ্যাত। শিল্পকলা থেকে শুরু করে অলিম্পিকের মঞ্চ এমনকি ফ্যাশান থেকে নোবেলের মঞ্চ সর্বত্রই মেয়েদের জয় জয়কার। আজ আলোচনা করবো আজীবন অর্থকষ্টে জর্জরিত দু’বার নোবেল (প্রথমে পদার্থ বিজ্ঞান পরে রসায়নে) পাওয়া বিজ্ঞানী মেরি কুরিকে নিয়ে। প্রথম নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী নারী পৃথিবীর বুকে একমাত্র নারী যিনি একাধিকবার নোবেল পুরষ্কার জিতেছেন, তাও আবার দুটি ভিন্ন বিষয়ে তিনি হলেন মেরি কুরি। ১৮৬৭ সালে পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মেরি কুরি (ম্যারি স্ক্লোদাওস্কা কুরিকে বা মাদাম কুরিকে) ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। স্কুলে বরাবর প্রথম হওয়া এই মেয়েটি প্রথম ধাক্কা খায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে, যখন জানতে পারে তাঁর এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল পুরুষ’দের জন্য উন্মুক্ত এবং সেখানে মেয়েদের কোন প্রবেশাধিকার নেই। এ কথা শুনে ভীষণ জেদ চেপে গেল কুরির। ছেলেবেলায় মা হারানো মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিলো বিজ্ঞান নিয়েই তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ, শহরের এক কোণে “ভাসমান বিদ্যালয়” নামে একটি জায়গা ছিল, যেখানে গোপনে কুরির মত অনেক জ্ঞানপিপাসু মেয়েরা পড়ালেখা করতো। কিন্তু এই সুযোগও বেশিদিন থাকলো না। অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে গেল বিদ্যালয়টি। কুরিও থেমে যাওয়ার পাত্রী নন। শুরু বেঁচে থাকার লড়াই। বহু বছর শিক্ষকতা আর গভর্নেনসের কাজ করে সংসারের খরচ যোগাতেন তিনি। অবসর সময়ে পদার্থ, রসায়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নিরন্তর পড়াশোনা করতেন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? অবশেষে বহু বছরের যা কিছু সম্বল সব নিয়ে পাড়ি জমালেন প্যারিসে। ভর্তি হলেন বিখ্যাত সারবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিষয় নিয়ে সবকিছু ভুলে গবেষণা করতে লাগলেন কুরি। কিন্তু পেট চালাতে রোজগার করতে হবে, এতে গবেষণার সময় কমে যাবে, তাই কুরি কোনমতে আধবেলা একবেলা খেয়ে সারাদিন পড়ে থাকতেন গবেষণাগারে। এতে একসময় স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়লো। কিন্তু কুরির এতে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। নিত্যনতুন সব অজানা বিষয়ে গবেষণায় দিনরাত কেটে যাচ্ছে মনের আনন্দে। এই গবেষণাগারেই পরিচয় হলো তার এক ফরাসী পদার্থ বিজ্ঞানীর সাথে, নাম তার পিয়েরে কুরি। বিজ্ঞান সাধনায় দুজনেরই অসীম আগ্রহ, পরিচয় থেকে পরিণয়। দুজন মিলে পদার্থ, রসায়ন, গণিত সহ বিজ্ঞানের নানান শাখায় গবেষণায় কাটাতে লাগলেন তাঁরা দিনরাত। দুই বিজ্ঞানীর এই গবেষণা বিফলে গেল না, বিয়ের মাত্র আট বছরের মাথায় পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জিতলেন এই দম্পতি একসাথে। ১৮৯৭-তে ইউরেনিয়ামের আলো বিকিরণের রহস্যভেদে নেমেছিলেন ম্যারি ও তাঁর স্বামী তথা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী পিয়ের কুরি। ১৯০৩ সালে আবিষ্কার হয় রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি। প্রবল গবেষণার জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় কুরি, ম্যারি এবং বিজ্ঞানী বেকারেলকে। পুরষ্কারের অর্থ প্রায় পুরোটাই খরচ করলেন গবেষণার কাজে। ইতিমধ্যে সংসার আলো করে এলো কুরি দম্পতির প্রথম সন্তান। কিন্তু এমন সময় সাংঘাতিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন প্রিয়তম স্বামী এবং বিজ্ঞান চর্চায় সহকর্মী পিয়েরে কুরি। শোকে বিহ্বল কুরি কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সিদ্ধান্ত নিলেন স্বামীর গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। খরচ যোগাতে সারবোনে যোগ দিলেন শিক্ষক হিসেবে, বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে প্রথম নারী প্রফেসর হলেন তিনি। দ্বিতীয় নোবেল পুরষ্কার এবং কন্ট্রোভার্সি পিয়েরের মৃত্যুর পর দুই নতুন মৌল আবিষ্কারের জন্য ফের ম্যারির নাম বিবেচনা করে নোবেল কমিটি। তবে এরমধ্যেই কন্ট্রোভারসিতে জড়িয়ে পরে ম্যারির নাম এবং একটি চিঠি ফাঁস হয়ে যায়। যার জেরে ম্যারি কুরির নোবেল পাওয়া উচিত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল নোবেল কমিটিতেই। চিঠি লিখে ম্যারিকে অনুরোধ করা হয়েছিল, নোবেল দেওয়া হবে, তবে তা নিতে তিনি যেন স্টকহোম না আসেন। অপমানে ক্ষুব্ধ ম্যারি যদিও স্টকহোম গিয়েছিলেন। পুরস্কার নেওয়ার পর বক্তৃতায় স্পষ্ট করেছিলেন, 'নোবেল দেওয়া হয় সাফল্যকে...ব্যক্তিকে নয়।' দুঃসহ বাধা ডিঙিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছিলেন তিনি। ১৯১১ সালে রসায়নে অনন্য অবদান রাখার জন্য আবার নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হলেন মেরি কুরি, সবার চোখের সামনে পুরষ্কার বিতরণী মঞ্চে কুরি একাই উঠলেন, কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না প্রিয় স্বামীর কথা। সারাজীবনের এত লড়াই সংগ্রাম আর স্বামীর মৃত্যুশোক কোনদিনই ভুলতে পারেননি তিনি। দুঃখ ভুলতে রাত-দিন গবেষণাগারেই পড়ে থাকতেন তিনি। এই অস্বাভাবিক খাটুনির ধকল পড়তে শুরু করলো তার শরীরে, বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হলো সমস্ত শরীর। ১৯৩৪-এর জুলাইয়ে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু মাদাম কুরির। এক্সরে মেশিন নিয়ে রণাঙ্গনে কুরি তার আগে তিনি বিজ্ঞানের জগতে তো বটেই, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সেনার চিকিৎসায় এক্স-রে মেশিন নিয়ে ছুটে বেরিয়ে ঘরে ঘরেও পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তবে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির জেরেই লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। দেখে যেতে পারেননি মেয়ে-জামাইয়ের নোবেল প্রাপ্তিও। তবু, নিজের গবেষণা ও আবিষ্কারের পেটেন্ট নিতে নারাজ ছিলেন মাদাম কুরি। বরং মানবসভ্যতার জন্যই আবিষ্কার, তাই তার উপর 'সবার অধিকার' থাকা উচিত বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। 'রেডিয়াম কোনও ব্যক্তিকে সমৃদ্ধ করতে নয়। এটি একটি মৌল, যার অধিকার শুধু মানুষের।' শেষজীবন পর্যন্ত একথাই বলেছিলেন বিজ্ঞানী কুরি। নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন মেরি কুরি, সমাহিত হলেন প্রিয়তম স্বামীর পাশেই। বিজ্ঞানের জগতে তার অসামান্য অবদান বিশ্ববাসী আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, এই সময়।